মিলাদুন্নবী ১৪৫৬, মদীনা সনদ হতে পারে জনআকাঙ্খা পূরণের মূল উপাদান
মোহাম্মাদ মাকছুদ উল্লাহ
পূর্ণ একটি বছরের দীর্ঘ পরিক্রমা অতিক্রম করে আবার এল রবিউল আউয়াল। হিজরি বর্ষপঞ্জির তৃতীয় মাস এটি, এটি বিশ্ব মানবতার সর্ব্বোত্তম আদশর্, শেষ নবী, শ্রেষ্ঠ নবী মোহাম্মাদে আরাবি (সা.) এর বেলাদাত ও ওফাতের মাস। সমগ্র বিশ্বে মুসলিম উম্মাহ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মিলাদুন্নবী পালন করে থাকে। মিলাদুন্নবীর আবেদন যে সীমাহীন একথা বলার অপেক্ষ রাখে না। কারণ জীবন, জগৎ ও সমাজের সাফল্যের একমাত্র সোপান হল, মহানবী (সা.) এর জীবনাদর্শ। মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন,‘নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালীন মুক্তির আশা রাখে এবং এবং আল্লাহকে স্মরণ করে তাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। (সুরা আল-আহযাব: ২১)
পৃথিবীর সর্বকালীন ইতিহাসের যঘণ্যতম সময়ে ৫৭০ খৃষ্টাব্দে জন্ম নিয়ে জীবনের সূচনালগ্ন থেকে হজরত মোহাম্মাদ (সা.) স্বজাতির অনৈতিকতা-অরাজকতা, শোষণ-নির্জাতন, হত্যা-লুন্ঠন, যুদ্ধ-বিগ্রহ, দেব-দেবির পুঁজা-আর্চণা দেখতে-দেখতে মনুষ্য সমাজের মারাত্মক অবক্ষয় ও মুক্তির উপায় নিয়ে ভাবতে-ভাবতে অস্থির হয়ে পড়ছিলেন। অবশেষে ৬১০ খৃষ্টাব্দে মহান রাব্বুল আলামিন তাঁকে রেসালাত দান করেন এবং উম্মতের মুক্তির গুরুদায়িত্ব তাঁকে অর্পণ করেনে। তিনি মহান রবের পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব পালন ও বিপথগামী মানব সমাজকে মুক্তির আহবান জানিয়ে ঘোষণা করেন,‘হে লোক সকল! তোমরা বল, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তাহলেই তোমরা মুক্তি লাভ করবে।’(সুনানে দারু কুতনি: ২৯৭৬) মক্কার তৎকালীন অধিবাসিরা হযরত মোহাম্মাদ (সা.) এর আহবানে সাড়া দিয়ে ইসলামের দীক্ষা নেয়া তো দূরের কথা, তারা তাঁর প্রতি সাংঘাতিক রুষ্ঠ হয়ে ওঠে এবং তাঁকে হকের পথ থেকে নিবৃত করতে বিভিন্ন ধরণের নিষ্ঠুরতার পথ বেছে নেয়। স্বয়ং আল্লাহর রাসুল ও নবদীক্ষিত মুসলমানদের উপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালাতে থাকে জাহেলি আরবরা। শেষ পর্যন্ত তারা হযরত মোহাম্মাদ (সা.) কে হত্যার ষঢ়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ওদিকে মহান আল্লাহ স্বীয় দ্বীনের সুরক্ষায় পরিকল্পনা করেন। ৬২১ খৃষ্টাব্দে খানায়ে বাবা জিয়ারাতে আসা ইয়াসরিব তথা মদিনার ১২ সদস্যের এক প্রতিনিধি দলের সাথে খাইবার গিরি পথে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সাক্ষাৎ হয়। তাঁরা মহানবীর দাওয়াতে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহন করেন এবং মদীনা ফিরে গিয়ে স্বজাতির কাছে মহাসত্যের আহবান পৌঁছে দেয়ার অঙ্গীকার করেণ। (ইতিহাসে এই অঙ্গীকার ‘আকাবার প্রথম বাইয়াত’ নামে খ্যাত) ফলশ্রুতিতে ৬২২ খৃষ্টাব্দে ৭৫ সদস্যের এক বিরাট প্রতিনিধি দল মদীনা থেকে আগমন করেন। বিস্তারিত আলোচনার পরে তাঁরা সকলে ইসলাম মগ্রহন করেন এবং মহানবী (সা.) ও মুসলমানদেরকে মদীনায় আমন্ত্রণ জানান। তাঁরা মনানবী (সা.), মুহাজিরগণ এবং ইসলামের র্সুক্ষায় প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করাসহ কয়েকটি শর্তে চুক্তিবদ্ধ হন। এটি ছিল আকাবার দ্বিতীয় বাইয়াত। এমন সময় আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আয়াত নাযিল করেণ,‘যারা নির্যাতিত হওয়ার পরে আল্লাহর জন্য হিজরত করেছে, আমি অবশ্যই তাদের জন্য দুনিয়াতে উত্তম আবাসনের ব্যবস্থা করে দিব আর পরকালের পুরস্কার তো সর্বোচ্চ; যদি তারা জানত! (সুরা আন-নাহল: ৪১) মদীনার অধিবাসীদের সাথে আকাবায় চুক্তি স্বাক্ষর অতঃপর আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে হিজরতকারীদের জন্য উত্তম আবাসনের প্রতিশ্রুতি ঘোষণার পর ৬২২ খৃষ্টাব্দের জুন মাসের প্রথম দশক থেকে সাহাবায়ে কেরাম খন্ড-খন্ড ভাবে ছোট-ছোট দলে মদীনায় হিজরত করতে থাকেন। প্রায় তিন মাস পরে মহানবী (সা.) হযরত আবু বকর (রা.)-কে সফরসঙ্গী হিসেবে নিয়ে মদীনা হিজরত করেন। ৬২২ খৃষ্টাব্দে সেপ্টেম্বর মাসের ২৭ তারিখ, রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে তিনি মদীনায় পৌঁছান। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে মনানবী (সা.) মদীনাকে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম, আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। মহানবী (সা.) মদীনাকে স্বাধীন-সার্বভৌম, আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছিলেন অতি সংক্ষেপে সেগুলো ছিল নিম্নরূপঃ
১. মসজিদে নবুবি প্রতিষ্ঠা: মহানবী (সা.) মদীনা পৌঁছানোর পরে কিছু দিনের জন্য অস্থায়িভাবে হযরত আবু আইউব আনসারি (রা.) এর গৃহে অবস্থান করেন। সেখানে থেকেই তিনি মসজিদ নির্মানের উদ্বোগ গ্রহন করেন। তিনি তৎকালীন বাজার দরে সম্পূর্ণ মূল্য (১০ স্বর্ণমুদ্রা) পরিশোধ করে দুটি এতিম বালকের জমি খরিদ করে মসজিদ নির্মাণ কাজ শুরু করেন। মহানবী (সা.) নিজে শারীরিকভাবে নির্মাণ কাজে অংশ গ্রহন করেন। মসজিদে নবুবির পাশে খেজুর পাতার ছাউনি ও বেষ্টনি দিয়ে কয়েকটি ছোট ঘর নির্মাাণ করা হয়, যেখানে রাসুলের পরিবারের আবাসন ব্যবস্থা করা হয়। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মসজিদে নবুবিই ছিল স্বাধীন-সার্বভৌম, আদর্শরাষ্ট্র মদীনার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। মসজিদে নবুবি ছিল একাধারে বিশ্ববিদ্যালয়, আশ্রয় কেন্দ্র, চিকিৎসা কেন্দ্র, সংসদ ভবন, সেনসদর দপ্তর এবং ইবদিাতগাহ। মদীনা কেন্দ্রিক ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও এর সুরক্ষায় মসজিদে নবুবির অপরিহার্যতা ছিল সর্বাগ্রে গণ্য। ২. মসজিদ নির্মাণের পর মহানবি (সা.) মুহাজিরদের সুরক্ষায় স্বচেষ্ট হন। কারণ আল্লাহর যমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সর্বোচ্চ ত্যাগি-রক্ত ঝরানো, সহায়-সম্পদ হারানো, স্বদেশ থেকে বিতাড়িত এই মজলুম মানুষগুলোই হল ইসলামি আন্দোলনের মূল স্প্রীট। আল্লাহর রাসুল (সা.) একদিন হযরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) এর বড়িতে ৪৫ জন মুহাজির ও ৪৫ জন আনসার মোট ৯০ সদস্যের এর মিলন মেলার আয়োজন করে একেক জন মুহাজিরের সাথে এক জন আনসারের ভ্রাতৃ সম্পর্ক স্থাপন করে দেন। যে সম্পর্কের আসল বুনিয়াদ ছিল ঈমানের ভিত্তিতে পারস্পরিক পরিপূর্ণতা। সেদিন স্থাপিত ভ্রাতৃ সম্পর্ক সম্পদের উত্তরাধিকারের সূত্র হিসেবেও গ্রোথিত হয়। অবশ্য সুরা আন-নিসাতে সম্পদ বন্টনের নীতিমালা অবতীর্ণ হবার পরে মুহাজির ও আনসার ভ্রাতৃ সম্পর্কের ভিত্তিতে উত্তরাধিকারের বিধান রহিত হয়ে যায়।
৩. ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষার অপহিার্য বিষয়গুলো সমাধার পরে মহানবী (সা.) রাষ্ট্রীয় সংবিধান রচনা করেন, যা মদীনা সনদ নামে খ্যাত। পৃথিবীর ইতিহাসে ‘মদিনা সনদ’ প্রথম লিখিত রাষ্ট্রীয় সংবিধান। ৪৭টি ধারা সম্বলিত মদীনা সনদ’ তথাকার অধিবাসি পারস্পরিক শত্রুতায় সুদীর্ঘ কাল ধরে বিভক্ত ও রণসংঘাতে ক্লান্ত ইহুদি-নাসারা ও পৌত্তলিক এবং মক্কা থেকে আগত মুহাজিরদেরকে নাগরিকত্বের একটি সুতোয় গেঁথে দিয়েছিল। একটি সফল-স্বার্থক, সমধিকার ও সুশাসন ভিত্তিক কল্যান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ঐতিহাসিক মদীনা সনদ আজ অবধি পৃথিবীর ইতিহাসে বিশেষ স্মরণীয়। নিবন্ধের সংক্ষিত কলেবরে আমরা মদীনা সনদের প্রধান ৭টি ধারা উল্লেখ করব। ১. মদীনাতে বসবাসকারি ইহুদি, খৃষ্টান ও মুসলমান মিলিত হয়ে একটি স্বতন্ত্র জাতি গঠন করবে এবং সকলে সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবে ২. এই সনদের অংশিদার কোন অংশ বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে সনদে স্বাক্ষরকারি সকলে সম্মিলিত ভাবে প্রতিহত করবে এবং আক্রান্তকে সহযোগিতা করবে ৩. মদীনা রাষ্ট্রে নাগরিক সুবিধা সবার জন্য সমান ও অবারিত থাকবে এবং সকলে নিজ নিজ ধর্ম স্বাধিন ভাবে পালন করবে। মদীনাতে সর্বতোভাবে মাজলুমকে সহযোগিতা করা হবে এবং জালিমকে প্রতিহত করা হবে ৪. সনদে স্বাক্ষকারি কেউ মদীনার জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি কোন ষঢ়যন্ত্র ও বহিঃশত্রু বিশেষত কোরাইশ ও তাদের কোন মিত্রের সাথে আঁতাত করতে পারবে না ৫. মদীনাকে পবিত্র ঘোষণা করা হলো, এর অভ্যন্তরে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, যুদ্ধ-বিগ্রহ, হত্যা-রক্তপাতসহ সকল ধরণের অপরাধমূলক কার্যকলাপ চিরদিনের জন্য নিষিদ্ধ থাকবে ৬. সনদে স্বাক্ষকারিদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ সৃষ্টি হলে বা কোন সমস্যা দেখা দিলে রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর বিধান অনুসারে তার সমাধান করবেন ৭. মদীনা কোন বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে স্বাক্ষকারি সকল পক্ষ সম্মিলিত ভাবে তার মোকাবেলা করবে। সকল পক্ষ নিজ নিজ অংশের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করবে এবং যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করবে। সনদে মহানবী হযরত মোহাম্মাদ (সা.) কে ইসলামি প্রজাতন্ত্র মদীনার রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশ স্বার্ধনতা অর্জনের পরে দীর্ঘ ৫৫ বছর পেরিয়ে আসার পরেও, বারবার সরকার পতন ও পরিবর্তনের পরেও শান্তি, সুশাসন ও নাগরিক অধিকার সুরাক্ষার মত মৌলিক দাবীগুলো আজও অধরা রয়ে গেছে। অন্যায়-অবিচার, শোষণ-নির্যাতন, গুম-খুন, লুটপাট, আইন ও বিচারের ছদ্যাবরণে প্রহসন ইত্যাকার দুঃসহ অবস্থা বাংলাদেশের মানুষকে আজও কাঁদায়। সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষ বিদ্যমান করুন অবস্থা থেকে মুক্তি চায়। মহানবি হররত মোহাম্মাদ (সা.) এর ১৪৫৬ তম বেলাদাত ও ১৩৯৪তম ওফাতে বার্ষিকীতে আমাদের উপলদ্ধি হলো, মদীনা সনদ’ হতে পারে জনআকাঙ্খা পূরণের মূল উপাদান।
লেখক: পেশ ইমাম ও খতীব, রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ।
