নতুন পে স্কেলে অপেক্ষা ফুরায়নি এমপিওভুক্ত ৬ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীর   

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগোলেও এখনো অনিশ্চয়তায় রয়েছেন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছয় লাখের বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী। নতুন বেতনকাঠামোতে তাঁদের মূল বেতন ও ভাতা বাড়ার কথা থাকলেও কবে থেকে তাঁরা নতুন স্কেলে বেতন পাবেন, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। এ জন্য অর্থ বিভাগের পৃথক আদেশ জারি এবং পরবর্তী প্রশাসনিক কার্যক্রম শেষ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য গত ১ জুলাই থেকে নতুন বেতনকাঠামো কার্যকরের বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় পরিপত্র জারি করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এরই মধ্যে অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে আগের তিন মাসের বকেয়া পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে নতুন বেতনকাঠামোর সুবিধা পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে কার্যকরের নির্দিষ্ট সময়সূচি এখনো জানা যায়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী বেতন দেওয়ার জন্য অর্থ বিভাগ থেকে আদেশ জারি করতে হবে। অর্থ বিভাগ সূত্রেও জানা গেছে, এ বিষয়ে আদেশ কবে জারি হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। পুরো বিষয়টি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো কার্যকরের প্রক্রিয়া শেষ করতে নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। কারণ ছয় লাখ শিক্ষক-কর্মচারীর তথ্য আপডেটের প্রয়োজন হতে পারে। এরপর সে অনুযায়ী তাঁদের জন্য বরাদ্দ পুনর্র্নিধারণ করতে হবে। এতে বেশ সময়ের প্রয়োজন। এখন অর্থ বিভাগের আদেশ জারি এবং পরবর্তী কার্যক্রম কত দ্রুত সম্পন্ন হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে কবে তাঁরা নতুন স্কেলে বেতন পাবেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা চাই এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা যেন দ্রুত নতুন বেতন স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা পান। এ জন্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমাদের আলাপ-আলোচনা চলছে। অবশ্যই তাঁরা নতুন বেতন স্কেল পাবেন। তবে একটু সময়ের প্রয়োজন হতে পারে।’

বর্তমানে সারা দেশে ছয় লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী এমপিওভুক্ত। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে প্রায় চার লাখ, মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে পৌনে দুই লাখ এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে ২৩ হাজারের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন।

সূত্র জানায়, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতন দেয় সরকার। মান্থলি পেমেন্ট অর্ডারের (এমপিও) মাধ্যমে তাঁদের এই বেতন দেওয়া হয়। মাধ্যমিক পর্যায়ের সহকারী শিক্ষকরা দশম গ্রেডে মূল বেতন পান। জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী এই গ্রেডের মূল বেতন ১৬ হাজার টাকা হলেও জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী হয়েছে ৩২ হাজার টাকা। অন্যদিকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রভাষকরা এত দিন নবম গ্রেডে ২২ হাজার টাকা মূল বেতন পেলেও নতুন বেতন স্কেল অনুযায়ী তা হবে ৪৪ হাজার টাকা। এ ছাড়া অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক এবং কর্মচারীরা তাঁদের নির্দিষ্ট গ্রেড অনুযায়ী মূল বেতন পান। জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী সব গ্রেডের বেতনই প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বাড়িভাড়া ভাতার ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিবর্তন এসেছে। গত বছর তাঁদের বাড়িভাড়া মূল বেতনের ১৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে তাঁরা মাসে এক হাজার টাকা করে বাড়িভাড়া পেতেন। নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হলে মূল বেতনের পাশাপাশি বাড়িভাড়া ভাতার পরিমাণও বাড়ার কথা। এ ছাড়া তাঁদের মূল বেতনের ৫০ শতাংশ উৎসব ভাতা এবং ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা দেয় সরকার। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামোতে গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এতে আগের মতো ২০টি গ্রেড রাখা হয়েছে। সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন আট হাজার ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে তিন ধাপে মূল বেতন কার্যকরের কথা রয়েছে। আর ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ভাতা একযোগে কার্যকর করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে এসব ধাপ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে কিভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনার ওপর। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয় তুলনামূলক বেশি। এসব প্রতিষ্ঠান এমপিওর বাইরে থেকেও শিক্ষক-কর্মচারীদের অতিরিক্ত অর্থ দিতে পারে। কিন্তু বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের সে ধরনের আর্থিক সক্ষমতা নেই। ফলে সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার প্রধান ভরসা সরকারি অনুদান। এই অবস্থায় নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বাড়তি আয় পাওয়ার অপেক্ষাও দীর্ঘ হবে। বিশেষ করে যাঁরা নির্ধারিত বেতন ও সীমিত ভাতার ওপর নির্ভর করে সংসার চালান, তাঁদের কাছে নতুন স্কেল কার্যকরের সময়টি গুরুত্বপূর্ণ।

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আলটিমেটাম : আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে নতুন পে স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা প্রদানের আলটিমেটাম দিয়েছে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোট। এই সময়ের মধ্যে নতুন পে স্কেলে বেতন-ভাতা দিতে না পারলে আগামী ৪ নভেম্বর রাজধানী ঢাকায় কর্মসূচি পালন করা হবে বলে জানিয়েছেন জোটের সদস্যসচিব ও বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষক-কর্মচারী ফোরামের সভাপতি অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী। দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, ‘সরকারি চাকরিজীবীরা এ মাসেই বাড়তি বেতন পাবেন, তবে আগের হারেই ভাতা পাবেন। তাহলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা কবে পাবেন তাঁদের ন্যায্য পাওনা, নাকি অধিকার আদায়ে আবারও আন্দোলনে নামতে হবে?’ সূত্র: কালের কন্ঠ

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট