চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৮ মাসে ১৮১ অপমৃত্যুর মধ্যে ৭০ জনের আত্মহত্যা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ৭০ জন আত্মহত্যা করেছেন। একই সময়ে জেলায় ১৮১টি অপমৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত করেছে পুলিশ। অর্থাৎ এ সময়ে নথিভুক্ত অপমৃত্যুর উল্লেখযোগ্য একটি অংশই আত্মহত্যাজনিত। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, আত্মহত্যার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের সংখ্যাই বেশি।
পুলিশ বলছে, প্রেমঘটিত বিষয়, পরীক্ষায় ব্যর্থতা, পারিবারিক অশান্তি, দাম্পত্য কলহ, অভিমান, মানসিক চাপ, আর্থিক সংকট ও ঋণের বোঝাসহ নানা কারণে মানুষ চরম হতাশার মধ্যে পড়ছেন। ফলে নথিভুক্ত অপমৃত্যুর উল্লেখযোগ্য একটি অংশই আত্মহত্যাজনিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সংকটে থাকা মানুষের পাশে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে দ্রুত এগিয়ে আসার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে পুলিশ।
৭০টি আত্মহত্যার ঘটনায় ১৮ বছরের কম বয়সী ১৫ জন। ১৯ থেকে ৩০ বছর বয়সী রয়েছেন ২৯ জন। অর্থাৎ ৩০ বছরের নিচেই রয়েছেন ৪৪ জন, যা মোট আত্মহত্যার প্রায় ৬৩ শতাংশ। এ ছাড়া ৩১ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ১২ জন, ৪৬ থেকে ৬০ বছর বয়সী ৯ জন এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সী ৫ জন আত্মহত্যা করেছেন।
এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হিসেবে তরুণ ও কিশোরদের সংখ্যা বেশি হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। জীবনের শুরুতেই নানা ধরনের আবেগ, সম্পর্ক, পড়াশোনা, পারিবারিক প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার চাপ অনেকের জন্য সংকট তৈরি করছে বলে মনে করছে পুলিশ।
পুলিশের পর্যবেক্ষণে আত্মহত্যার পেছনে একটি নির্দিষ্ট কারণকে দায়ী করা যাচ্ছে না। কোনো ক্ষেত্রে প্রেমঘটিত বিষয় বা সম্পর্কের টানাপোড়েন, কোথাও পরীক্ষায় ব্যর্থতা, আবার কোথাও পারিবারিক বিরোধ ও দাম্পত্য কলহের মতো বিষয় সামনে এসেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মানসিক চাপ, আর্থিক সংকট ও ঋণের বোঝা।
বিশিষ্ট সমাজসেবক মনিরুজ্জামান মনিরের মতে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে কোনো ঘটনা বা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সাময়িক হতাশা কখনো কখনো গুরুতর সংকটে রূপ নিতে পারে। অভিভাবকদের অতিরিক্ত প্রত্যাশা, ফলাফল নিয়ে চাপ, সম্পর্কের সমস্যা কিংবা পরিবারের সঙ্গে দূরত্বও তাদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, আত্মহত্যার আচরণ কোনো একক ঘটনা বা কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। স্বাস্থ্যগত বিষয়, মানসিক চাপ, সম্পর্কের সংকট, আর্থিক সমস্যা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, সহিংসতা ও নানা ধরনের জীবন-সংকট পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
জেলা পুলিশের পরিসংখ্যানে আত্মহত্যার ঘটনায় নারীদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য বলে জানানো হয়েছে। পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য অসন্তোষ, মানসিক চাপ ও সামাজিক প্রত্যাশার মতো বিষয় নারীদের একটি অংশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
এরআগে শিবগঞ্জের মনাকষা ও ছত্রাজিতপুর ইউনিয়নেও পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রী হত্যার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা শুধু আত্মহত্যার প্রবণতা নয়, পারিবারিক সংকট ও সহিংসতার মধ্যকার সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ এন এম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। একই সঙ্গে সন্তানদের শুধু পরীক্ষার ফলাফল বা পড়াশোনার সাফল্যের দিক থেকে না দেখে তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিও নজর দেওয়ার জন্য অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সম্মিলিতভাবে সচেতন হতে হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা সাময়িক মানসিক সংকটের কারণে একটি সম্ভাবনাময় জীবন যেন শেষ হয়ে না যায়। শিশু-কিশোরদের আচরণে পরিবর্তন বা হতাশার লক্ষণ দেখা দিলে বকাঝকা না করে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং সহমর্মিতার সঙ্গে কথা বলতে হবে।
আদিনা ফজলুল হক সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ড, মাজহারুল ইসলাম তরু বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে শুধু চিকিৎসা নয় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক চাপ মোকাবিলার দক্ষতা বাড়ানো, সংকটে থাকা ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করা এবং তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।
