সম্পাদকীয়

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট : শুধু কথা নয় কাজ চাই

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে নাজেহাল দেশের মানুষ। ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তায় এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও মূল্যস্ফীতির ধকল চলছে। কিন্তু নির্বাচনে বিপুল জয়লাভের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারকে বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ভগ্ন-অর্থনীতিসহ নানাবিধ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বিশেষত বিদ্যুতের লোডশেডিং ও গ্যাস সংকট সরকারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। পতিত স্বৈরাচারের দোসর ও ঘাপটি মেরে থাকা তার দলীয় কর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে সরকারের ব্যর্থতা প্রমাণে মরিয়া হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট উত্তরণ ছাড়া অর্থনীতির কোনো লক্ষ্যই অর্জন করা সম্ভব নয়। তারেক রহমানের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও লক্ষ্যমাত্রা ঠিক রাখতে হলে প্রথমেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং এ খাতের পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সংকট উত্তরণের প্রথম ধাপ হচ্ছে— সংকটের প্রকৃতি অনুধাবন করে তা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে মনোযোগ দেয়া। কিছুদিন আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রীর বক্তব্যে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু ইতোমধ্যে অবস্থার বেশ কিছু অগ্রগতি ও আশাবাদ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে বক্তব্য দিতে গিয়ে জ্বালানি সংকট উত্তরণে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট যথাযথভাবে মোকাবিলার ওপর আগামী দিনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান অনুঘটক। চলমান বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে সরকারের জরুরি পদক্ষেপের সফলতার ওপর তার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করবে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দৃশ্যমান অগ্রগতির আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ মহেশখালীর গ্যাস টার্মিনালে গ্যাস সঞ্চালন শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে আগামী এক-দেড় সপ্তাহের মধ্যে গ্যাস সংকট কাটিয়ে ওঠার কথা জানিয়েছেন। তবে শুধু মুখের কথায় ‘চিড়া ভিজে না’। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের ত্বরিৎ বিকল্প উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে মানুষ দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চায়। গতকাল প্রকাশিত সেপ্টেম্বর মাসের এলপিজি গ্যাসের দাম ১২ কেজি সিলিন্ডারের জন্য ১৩ টাকা কমিয়ে আনার মাধ্যমে গ্যাস সংকট কাটিয়ে উঠার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট একটি বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক সংকটের অংশ। এর সাথে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির সরাসরি সম্পর্ক বিদ্যমান। বিশেষত বিশ্বের প্রধান জ্বালানি শক্তি সউদী আরব ও ইরানের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নেপথ্য ভূমিকার ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করছে। এ ক্ষেত্রে কাতার থেকে এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে জাহাজের হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশি জাহাজের জন্য ইরানের বিশেষ ছাড় দেয়ার ঘোষণা অনেক বড় অর্জন। সেই সাথে মক্কা নিরাপত্তা চুক্তিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ইরানের ইতিবাচক সংকেত বাংলাদেশের জন্য নতুন বাস্তবতার সংকেত। ইরান, সউদী আরব, চীন ও তুরস্কের মতো আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক অংশীদারদের কাছ থেকে বাংলাদেশ বিশেষ সুবিধা বা আনুকুল্য লাভ করলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও প্রতিবেশী ভারতের ভূমিকা ভিন্নভাবে মোকাবিলা করতে হবে। তবে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনো আপসের সুযোগ নেই। অর্থনৈতিক কিংবা বৈশ্বিক সংকটের দোহাই দিয়ে গ্যাস-বিদ্যুৎ নিয়ে মানুষের ভোগান্তিকে জাস্টিফাই করা যাবে না। সরকার পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলো উন্নয়ন করার সাথে সাথে নতুন গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে গ্যাস উত্তোলনে বাড়তি গুরুত্বারোপ করবে। সেই সাথে ফুলবাড়ী কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলন নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা ও দীর্ঘসূত্রতার পরিসমাপ্তি হওয়া জরুরি। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সৃষ্ট জনদুর্ভোগের নেপথ্যে যাই থাকুক, এর পুরো দায় ও বদনাম চাপছে প্রধানমন্ত্রীর ওপর। আমলাতান্ত্রিক লাল-ফিতার দৌরাত্ম্য ও সিদ্ধান্তহীনতার গতানুগতিক চিত্র এখন বদলাতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ত্বরিৎ সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীকেই নিতে হবে।
 

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট