সাড়ে ছয় বছরে ১৬ রাবি শিক্ষার্থীর ‘আত্মহত্যা’

রাবি প্রতিনিধি

কখনো মেস, কখনো ছাত্রাবাস, কখনো বা নিজ বাড়িতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একের পর এক আত্মহত্যার ঘটনা যেন থামছেই না। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সাড়ে ছয় বছরে অন্তত ১৬ শিক্ষার্থী ‘আত্মহত্যা’ করেছেন। তাদের বড় একটি অংশই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের বাইরে মেস, ছাত্রাবাস ও ভাড়া বাসায় ছিলেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকট সময়মতো চিহ্নিত করতে না পারা এই ধারাবাহিক মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।

সর্বশেষ গত ১০ জুন ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমানের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ‘আয়েশা টাওয়ার’ ছাত্রাবাস থেকে। এর আগে সম্প্রতি গণিত বিভাগের এক শিক্ষার্থী প্রকাশ্যে বিষাক্ত পদার্থ পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরপর এসব ঘটনায় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়ে ওঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও জনসংযোগ দপ্তরের তথ্য এবং বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

আত্নহত্যার ১৬টি ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে আবাসিক হলের বাইরে বিশেষ করে মেহেরচণ্ডী, মির্জাপুর, বিনোদপুর ও আমজাদের মোড়ের মেস ও ছাত্রাবাসে। ২০১৯ সালের ২৮ অক্টোবর ফলিত গণিত বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফিরোজ কবীরের মরদেহ উদ্ধার করা হয় ক্যাম্পাসসংলগ্ন আমজাদের মোড় এলাকার একটি মেস থেকে। পরের বছর ১৯ ডিসেম্বর পটুয়াখালীতে নিজ বাড়িতে মারা যান নৃবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী দেবজ্যোতি বসাক পার্থ। ২০২১ সালের ৩০ জানুয়ারি মির্জাপুর এলাকার একটি আবাসিক ছাত্রী হোস্টেল থেকে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মোবাসসিরা তাহসিন ইরার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই সময়ে পুলিশ জানায়, ঘটনার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় সামনে এসেছিল। ওই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর মায়ের উপর অভিমান করে নিজ বাড়িতে আত্মহত্যা করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ইমরুল কায়েস।

২০২২ সালেও একের পর এক আত্নহত্যার ঘটনা ঘটে। ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ইশতিয়াক মাহমুদ পাঠান নিজ বাসায় মারা যান। ৯ এপ্রিল প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সোহাগ খন্দকার নীলফামারীর সৈয়দপুরে নিজ বাড়িতে আত্মহত্যা করেন।

১৩ মে ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া তাবাসসুম নিজ ঘরে মারা যান। মৃত্যুর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হতাশা ও বিষণ্ণতার কথা লিখেছিলেন তিনি। ৬ জুন নাট্যকলা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জান্নাতুল মাওয়া দিশার মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ২৬ সেপ্টেম্বর বিয়ের মাত্র তিন মাসের মাথায় মারা যান অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছন্দা রায়।

২০২৩ সালের ২০ জানুয়ারি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাইমা আরাবী ইভা। অতিরিক্ত ওষুধ সেবনের পর তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। একই বছরের ৮ জুন বিনোদপুর এলাকার একটি মেস থেকে লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মো. তানভীর ইসলাম রিতুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর পড়ার টেবিল থেকে একটি চিরকুট উদ্ধারের কথাও জানা যায়। ১০ সেপ্টেম্বর শহীদ শামসুজ্জোহা হলের একটি কক্ষ থেকে সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী ফুয়াদ আল খতিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর ২০২৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মেহেরচণ্ডী এলাকার একটি ছাত্রাবাস থেকে ফিশারিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সিফাতুল্লাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ১২ নভেম্বর মির্জাপুর এলাকার একটি আবাসিক ভবন থেকে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী সোনিয়া সুলতানার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর কক্ষ থেকে কয়েকটি চিরকুট উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছিল।

বছরের শেষ দিন, ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বিনোদপুরের লেবুবাগান এলাকার একটি মেস থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী লামিসা নওরীন পুষ্পিতার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি মেহেরচণ্ডী এলাকার একটি ছাত্রাবাস থেকে সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী জুবাইদা ইসলাম ইতির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

সবশেষ ১০ জুন ‘আয়েশা টাওয়ার’ ছাত্রাবাস থেকে ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমানের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, আত্মহত্যার পেছনে একক কোনো কারণ থাকে না। পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক প্রত্যাশা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, আর্থিক সংকট, ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা, একাকীত্ব ও দীর্ঘস্থায়ী হতাশা বিভিন্ন বিষয় একসঙ্গে কাজ করতে পারে। তবে প্রতিটি মৃত্যুর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কারণ আলাদাভাবে তদন্ত করে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রধান চিকিৎসক অধ্যাপক মুর্শিদা ফেরদৌস বিনতে হাবিব বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতার পেছনে সামাজিক, মানসিক ও আর্থিক বিভিন্ন কারণ রয়েছে। প্রেম বা সম্পর্কজনিত টানাপোড়েন, পারিবারিক কলহ, আর্থিক সংকট, একাকীত্ব ও হতাশা থেকে আত্মহত্যার চিন্তা তৈরি হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের আত্মহত্যার ঘটনাও কেউ কেউ অনুসরণ বা অনুকরণ করতে পারেন।’

অধ্যাপক মুর্শিদা ফেরদৌস আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের পরিবার, শিক্ষক ও বন্ধুদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখা জরুরি। পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকাও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় হতাশা বা বিষণ্ণতা অনুভূত হলে দ্রুত মনোবিজ্ঞানী বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সংকটে থাকা শিক্ষার্থীর পাশে থাকার মতো মানুষ ও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবর রহমান বলেন, ‘মেসে থাকা বা আবাসিক হলে থাকার সঙ্গে আত্মহত্যার সরাসরি কোনো সম্পর্ক আছে বলে আমি মনে করি না। মেসে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে একা থাকায় সেখানে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এসব আত্মহত্যার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো মানসিক সমস্যা, হতাশা, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারা এবং সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্কজনিত টানাপোড়েন।’

তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের সুস্থ মানসিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে খেলাধুলা, সহশিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন। মানসিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বিভিন্ন সেলের মাধ্যমে কাউন্সেলিং দেওয়া হচ্ছে। প্রক্টর অফিসও বিষয়গুলো নিয়মিত দেখভাল করছে।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট