বাংলাদেশকে সব সময় দুর্বল রাখাই ভারতের রাজনৈতিক কৌশল: আশরাফ কায়সার
ভারত সব সময় একটি দুর্বল বাংলাদেশ দেখতে চায় এবং এটিই তাদের আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক কৌশল বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশরাফ কায়সার। সম্প্রতি একটি টকশোতে দেওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যে তিনি ভারতের রাজনীতিতে বাংলাদেশের গভীর প্রভাব উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশ ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক চর্চার একটি বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশ। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং নরেন্দ্র মোদীর রাজনৈতিক দর্শনে বাংলাদেশের অবস্থান এটাই প্রমাণ করে যে, তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ স্বার্থেই বাংলাদেশকে একটি নির্দিষ্ট সমীকরণে রাখতে চায়।
বাংলাদেশে ভারতের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ এবং পতিত স্বৈরাচারের সেখানে আশ্রয় পাওয়ার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই বিশ্লেষক বলেন, বাংলাদেশে ভারতের একটি অত্যন্ত অনুগত রাজনৈতিক দল রয়েছে। এই দলটি কেবল ক্ষমতার লোভ বা দিল্লির প্রতি অন্ধ আনুগত্যের কারণে ১৯৭১ পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে দেশের নদী, পথঘাট ও সীমান্ত ভারতকে উজাড় করে দিয়েছে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ‘স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক’ বলে আখ্যায়িত করেছে। বর্তমানে ওই দলের অনেক সদস্যই কোনো বৈধ পাসপোর্ট ছাড়াই ভারতে যাতায়াত করছে, সেখানে আশ্রয় ও বাড়ি ভাড়া পাচ্ছে এবং সুযোগ বুঝে পুনরায় বাংলাদেশে অন্যায়ভাবে প্রবেশ করার নানামুখী হুমকি দিচ্ছে। আশরাফ কায়সার মনে করেন, এই কঠিন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ঝুঁকি মেনে নিয়েই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নির্ধারণ করতে হবে। “দেশের অভ্যন্তরে থাকা একশ্রেণীর তাঁবেদার, দাস, কালচারাল ফ্যাসিস্ট ও বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী এখনো সেই পতিত স্বৈরাচারী শক্তিকে ফিরিয়ে এনে পুনরায় সুবিধাভোগী হওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, যা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য এক বড় হুমকি’’, বলেন তিনি।
দেশের সামরিক বাহিনীর অতীত বিশৃঙ্খলা ও বর্তমান স্থিতিশীলতার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন আশরাফ কায়সার। তিনি অতীতে পাকিস্তান ফেরত অফিসার ও দেশের ভেতর থাকা মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের মধ্যকার ক্ষমতার লিপসা নিয়ে কথা বলেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ১৯৭৫ সালের ৩ মাসের মধ্যকার অভ্যুত্থান কিংবা পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের শাসন আমলে সেনাবাহিনীর ভেতরে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ব্যাপক খুনখারাবি ও বিশৃঙ্খলা হয়েছিল। সামরিক বাহিনীর একশ্রেণীর সদস্যরা কু বা অভ্যুত্থানের অর্থ জোগাড় করার জন্য ঢাকা-ময়মনসিংহ বাস সার্ভিস পর্যন্ত চালু করেছিলেন, যা একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশের সামরিক কাঠামোর সাথে কোনোভাবেই মানানসই ছিল না। সেই চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অত্যাচারের ইতিহাস পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ যেভাবে অটুট রয়েছে এবং একটি পেশাদার বাহিনী হিসেবে রূপ নিয়েছে, তাকে একটি আশ্চর্যজনক ও ইতিবাচক ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সুফল এবং এর পরবর্তী রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি প্রসঙ্গে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এই বিশ্লেষক বলেন, এই গণঅভ্যুত্থানে যে ১৪০০ মানুষ জীবন দিল এবং যারা চোখ হারিয়ে অন্ধত্ব বরণ করল, তারা প্রকৃতপক্ষে কিছুই পায়নি। অথচ তাদের এই মহান ত্যাগের বিনিময়ে রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার বেনিফিশিয়ারি বা সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দল ও ছাত্র আন্দোলনের একাংশ ৫ই আগস্টের পর নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে, যা তাদের পূর্ববর্তী অর্থনৈতিক বা সামাজিক অবস্থানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, পতিত আওয়ামী লীগ সরকার যেভাবে দীর্ঘ এক যুগ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নিয়ে নিকৃষ্ট ব্যবসা করেছে, ঠিক একইভাবে বর্তমানের অনেকেই ‘জুলাই চেতনা’ নিয়ে নতুন করে ব্যবসা শুরু করেছেন, যা গণঅভ্যুত্থানের মূল স্পিরিটকে ধ্বংস করছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সুবিধাভোগীদের প্রসঙ্গে আশরাফ কায়সার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, আন্দোলনে যেসব মানুষ জীবন দিয়েছে তারা কিছুই পায়নি, অথচ তাদের এই ত্যাগের বিনিময়ে বিএনপি ক্ষমতার সমীকরণে এগিয়ে এসেছে এবং জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি বিতর্কিত দল সংসদের বিরোধী দল (লিডার অব দ্য অপোজিশন) হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এছাড়া বর্তমানে দেশের গণমাধ্যমগুলো পেশাদার ভূমিকা পালন না করে বিভিন্ন টকশো ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একপ্রকার প্রতিযোগিতায় নেমে যেন বিএনপির বা এনসিপির মিডিয়া হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে বলেও তিনি সমালোচনা করেন। তিনি এক চিরন্তন রাজনৈতিক সত্যের অবতারণা করে বলেন, ক্ষমতার চেয়ারে বসলে মানুষের মাঝে চিরস্থায়ী হওয়ার একটি অন্ধ ঘোর বা মোহ তৈরি হয়, যা বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের সাধারণ মানুষের ধৈর্যের সীমা কিন্তু শেষ হয়ে আসছে। বর্তমান সরকার এবং রাজনৈতিক মঞ্চে থাকা মূল ধারার নেতাদের চরম ব্যর্থতা ও সুবিধাবাদী রাজনীতির কারণেই আজ পতিত ও পলাতক স্বৈরাচারী শক্তি নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার এবং দেশের মানুষের সামনে কথা বলার সাহস পাচ্ছে। সূত্র: ইনকিলাব
