পর্তুগালের যে মসজিদ মানুষের হৃদয় কাড়ে
লিসবনে একটি মসজিদ নির্মাণের স্বপ্ন ডানা মেলতে শুরু করেছিল ১৯৬৬ সালে। সে বছর ১০ জন লিসবনবাসীর একটি দল (যার মধ্যে পাঁচজন মুসলিম ও পাঁচজন অমুসলিম ছিলেন) মেয়রের কাছে মসজিদ নির্মাণের অনুমতি চান, কিন্তু পৌরসভা তা প্রত্যাখ্যান করে। পরে ১৯৬৮ সালে মোজাম্বিকসহ বিভিন্ন পর্তুগিজ উপনিবেশ থেকে মুসলিম শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার জন্য লিসবনে আসতে শুরু করলে একটি মসজিদের প্রয়োজনীয়তা তীব্রতর হয়।
অবশেষে ১৯৭৩ সালের আরব তেলসংকটের পর মুসলিম দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পেলে ১৯৭৮ সালে পর্তুগিজ সরকার মসজিদ নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমতি দেয়। ১৯৭৭ সালে লিসবনের তৎকালীন মেয়র জমি বরাদ্দ করেন এবং ১৯৭৯ সালে মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। দীর্ঘ সাত বছরের নির্মাণকাজ শেষে ১৯৮৫ সালে এই ঐতিহাসিক মসজিদের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। মসজিদটি নির্মাণে সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, লিবিয়া, মিসর, পাকিস্তান ও ইরানের মতো মুসলিম দেশগুলো বিপুল আর্থিক অনুদান দেয়। বিশেষ করে, সৌদি আরবের তৎকালীন বাদশা খালিদ বিন আবদুল আজিজ আস-সাউদের নির্দেশনায় বড় অঙ্কের অনুদান আসে। ১৯৮১ সালে এই মসজিদের সম্মানে রাস্তার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘রুয়া দেল মস্কিতো’ বা ‘মসজিদ সড়ক’। তৎকালীন প্রিন্স সালমান বিন আবদুল আজিজ (পরে বাদশাহ) অনুদানের শেষ কিস্তি নিয়ে লিসবন আসেন এবং একটি মূল্যবান উপহার হিসেবে ‘কাবার কিসওয়া’ (কাবার গিলাফের অংশ) দেন, যা আজও মসজিদের দেয়ালে শোভা পাচ্ছে।
২০১৯ সালের ‘রাফায়েল মানজানো পুরস্কার’ বিজয়ী স্থপতি আন্তোনিও মারিয়া ব্রাগা ও স্থপতি জোয়াও পাওলো কনসেইসাও-এর যৌথ নকশায় নির্মিত হয়েছে এই অসাধারণ মসজিদ। ঐতিহ্যবাহী ইসলামি স্থাপত্য ও পর্তুগিজ স্থানীয় শৈলীর এক অপূর্ব মিশ্রণ ঘটেছে এখানে। একটি সুউচ্চ মিনার ও তিনটি গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদে রয়েছে সুদৃশ্য রিসেপশন হল, মূল প্রার্থনাকক্ষ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও একটি সুবিশাল অডিটরিয়াম। মসজিদের ভেতরের দেয়ালগুলো চমৎকার আরবি ক্যালিগ্রাফি ও সূক্ষ্ম নকশায় সজ্জিত। একসঙ্গে এক হাজারের বেশি মুসল্লি এখানে সালাত আদায় করতে পারেন। ২০১৫ সাল থেকে এই মসজিদের প্রধান ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন হাফেজ শায়খ ডেভিড মুনির। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হওয়ায় পর্তুগাল সরকার এই কেন্দ্রকে কোনো আর্থিক সহায়তা দেয় না। তা সত্ত্বেও স্থানীয় মুসলিমদের ও মুসলিম দেশগুলোর সহায়তায় মসজিদটি লিসবনের বুকে মানবতার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছে।
২০১১ সাল থেকে এই মসজিদ একটি কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট দিনে সমাজের অভাবী মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া প্রতিবছর ক্রিসমাসের (বড়দিন) এক সপ্তাহ আগে থেকে এই মসজিদ লিসবনের প্রায় ২০০ জন অমুসলিম ও অভাবী মানুষকে প্রতিদিন খাবার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর বক্স উপহার দেয়। বছরজুড়ে বস্ত্রহীনদের মাঝে পোশাক বিতরণের কাজও চলে এখানে। রমজান মাসে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মানুষের জন্য ফ্রি ইফতারের আয়োজন করা হয় এই মসজিদে। এখানে ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এবং বর-কনেপক্ষের ভোজ আয়োজনের জন্য রয়েছে হালাল খাবারসমৃদ্ধ ডাইনিং হল। এ ছাড়া মরদেহ গোসল ও জানাজা শেষে পর্তুগাল সরকারের দান করা নিজস্ব মুসলিম কবরস্থানে দাফনের সুব্যবস্থা রয়েছে এখানে। সূত্র: আজকের পত্রিকা
