টুং টাং শব্দে মুখর রাজশাহীর কামারপট্টি হাতিয়ারের দাম কম হলেও ক্রেতা বেশি থাকায় সন্তুষ্ঠ কারিগররা

হাবিব আহমেদ

আর মাত্র চারদিন পরে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আযহা। দিন গুনতে গুনতে যেনো সময় শেষ। শেষ সময়ে এসে কেউ ছুটছেন পশুর হাটে আবার কেউ ছুটছেন কামারপট্টিতে। দুই মিলেই যেনো ব্যস্ততার শেষ নেই। শেষ সময়ে এসে যেমন কোরবানীর পশুর হাটগুলো জমে উঠেছে, তেমনি ব্যস্ত সময় পার করছেন কামারপাড়ার অস্ত্র তৈরির কারিগররা। সকাল থেকে রাত অবদি চলছে পশুর হাটে কেনাকাটা, আবার সকাল থেকে রাত সাড়ে ১০ টা থেকে ১১ পর্যন্ত হচ্ছে কামারপট্টির টুং টাং শব্দ। টুং টাং শব্দে মুখর থাকছে প্রতিটি কামারপট্টি। ব্যস্ততার যেনো শেষ নেই কামারপট্টিতে। বলাই যায়, নাওয়া, খাওয়া ছেড়ে অস্ত্র তৈরিতে ব্যস্ত কামারপট্টির কারিগররা। তবে এবার লোহার দাম বেশি হলেও দা, বটি, চাপাতি, ছুরি, চাকুর দাম কম। যার কারণে তৈরি করা এসব অস্ত্র বিক্রি করে খুব বেশি খুশি হতে পারছেন না কারিগররা। তারপরও বেচাবিক্রি ভাল হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করছেন কামাররা।

নগরীর বহরমপুর মোড়ের রেল লাইনের দক্ষিন পাশে চারটি কামারের দোকানে দা, বটি, চাপাতি, ছুরি, চাকুরসহ অন্যান্য অস্ত্র তৈরি করা হয়। চারটি দোকানের মধ্যে পুরোনো কারিগরের নাম মিলন। তিনি দুই যুগ ধরে এখানে অস্ত্র তৈরি করে। প্রতি বছর কোরবানীর ঈদ এলে তিনি বাড়তি শ্রমিক নেন। কারণ এই সময়ে একার পক্ষে অস্ত্র বানিয়ে সামাল দেয়া একার পক্ষে সম্ভব হয় না। এবারো তিনি নিজে কাজ করার পাশাপাশি তিনজন শ্রমিক নিয়েছেন। তৈরি করছেন দা, বটি, চাপাতি, ছুরি, চাকুসহ পশু জবাই করা থেকে শুরু করে যাবতীয় কাজে ব্যবহৃত অস্ত্র। এছাড়াও পুরোনো অস্ত্রগুলো সান দেয়ার কাজও চলছে এরমধ্যেই। কথা বলা হয় অস্ত্রের কারিগর মিলনের সাথে। তিনি বলেন, এবার লোহার দাম বাড়তি। কিন্তু পশু জবাই থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহৃত অস্ত্রের দাম তুলনা মুলক কম। গত বছর লোহার দাম কম ছিল অস্ত্রের দাম বেশি ছিল। লাভও ভাল হয়েছে। তিনি বলেন, এবার ক্রেতার সংখ্যা গত বছরের চেয়ে অনেক ভাল। দাম কিছুটা কম হলেও ক্রেতার সংখ্যা বেশি হওয়ায় আমরা সন্তুষ্ট। আর বাইরে থেকে যেসব দা, বটি, চাপাতি, হাসুয়া, ছুরি, চাকু সান দেয়ার জন্য আসছে তাতে এবার খুব ভাল কাজ হচ্ছে। তিনি বলেন, এবার চাপাতি বিক্রি হচ্ছে সাড়ে চারশ থেকে পাঁচশ টাকা কেজি, বটি তিনশ, ফোল্ডিং বটি বিক্রি হচ্ছে ছয়শ, ছুরি চারশ টাকা। এরমধ্যে ৬০টাকা থেকে ১০০টাকায় বিক্রি হচ্ছে বড় ও বিভিন্ন ধরনের চাকু। আর বটি, হাসুয়াতে সান দিতে নেয়া হচ্ছে ২০ থেকে শুরু করে ৫০ টাকা পর্যন্ত ও চাপাতি সান দিতে নেয়া হচ্ছে একশ টাকা। মিলনের পাশের আরো তিনটি দোকানেও একই দামে বিক্রি হচ্ছে অস্ত্র। চলছে অবিরাম টুং টাং শব্দ। তারাও সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করেন।

রাজশাহী নগরীর শিরোইল স্টেডিয়াম মার্কেটের ভাঙ্গড়িপট্টিতে ৩৪ বছর ধরে কামার পেশায় কাজ করছেন ভেলু কর্মকার। তারপাশেই রয়েছে আরো একজন কামার। ভেলু বলেন, এবার কোরবানীর মৌসুম শুরু থেকেই আমাদের কাজের চাপ বেড়েছে। অস্ত্র বিক্রি কম থাকলে চলছে বাইরের অস্ত্রের সান দেয়া কাজ। আর ক্রেতার চাহিদা বেশি থাকলে চলছে অস্ত্র তৈরির কাজ। তিনি বলেন, এবার অস্ত্র বিক্রি করে খুব বেশি লাভ না হলেও আমরা সন্তুষ্ঠ। কারণ ক্রেতা গমাগম এবার বেশি। তাছাড়াও আলাদা করেই পুরোন অস্ত্র সান দেয়ার জন্য লোক নেয়া আছে। সান দিয়েও দিনে মোটামুটি টাকা এবার আয় হচ্ছে। যা বিগত বছরগুলোতে কম ছিল।

নগরীর বিভিন্ন কামারপট্টি ঘুরে ও তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শুধু রাজশাহী নগরীতেই প্রায় শতাধিক কামার কাজ করেন। তবে এসব কামারের দোকান এক জায়গায় না থেকে এলাকা ভিত্তিক হয়েছে। এক জায়গায় সর্বোচ্চ দুই থেকে তিনটি দোকান রয়েছে। আর উপজেলা পর্যায়ে কামারের সংখ্যা বেশি। উপজেলা পর্যায়ের হাট বাজারে রীতিমত আলাদাভাবেই কামারপল্লী রয়েছে। আর এসব কামারপট্টিতে চলছে কোরবানীর কাজে ব্যবহৃত অস্ত্র তৈরি কাজ। বেশিরভাগ কারিগররা বলছেন, ঈদের আগের তিনদিন বেশি ভীড় হয়। দুদিন আগে তো দম ফেলানোর সময় পাওয়া যায় না। আর এক মাত্র কোরবানীর আয় দিয়েই তারা সারাবছর ব্যবসা করে থাকেন, এমন করছেন অনেকেই।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট