মৃত শিশুদের ৫৪ শতাংশ ৬ মাসের কম বয়সী রাজশাহীতে টিকা নেওয়ার বয়সের আগেই হামে আক্রান্ত শিশুরা, মারা যাচ্ছে তারাই বেশি

স্টাফ রিপোর্টার

কুষ্টিয়া থেকে দুই মাসের শিশু সন্তান হোসাইনের হামের উপসর্গ নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (রামেক) ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে ছোটাছুটি করছিলেন হেলাল উদ্দীন। কখনো বাচ্চা সামলাচ্ছেন, কখনো ছুটছেন ওষুধ কিনতে আবার কখনো ডাকতে যাচ্ছেন ডাক্তার-নার্সদের। তার চোখে মুখে অসহায়ত্ব। বলছিলেন, ‘সরকার নিয়ম করেছে ৬ মাসে হামের টিকা দেওয়ার। কিন্তু আমার বাচ্চা দুই মাসেই হামে আক্রান্ত। অধিকাংশ বাচ্চাদেরই এক-দুই মাস বয়সেই হাম হচ্ছে। এতে অনেকেই মারা যাচ্ছে। আমার মনে হয়- জন্মের পরপরই শিশুদের হামের টিকা দেওয়া দরকার।’

হেলালের কথার সূত্র ধরে সমকাল হাম আক্রান্তদের কিছু তথ্য সংগ্রহ করে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় থেকে। এতে দেখা যায়, রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ে হাম উপসর্গ ও আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত ৭৯ জনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। তবে তাদের মধ্যে ১৩ মে পর্যন্ত মাত্র ২৪ জন মৃত শিশুর পরিচয়সহ একটি তালিকা সংরক্ষণ করা হয়েছে। মৃত অন্য শিশুদের কোন তথ্য নেই কার্যালয়টিতে। এই মৃত ২৪ জন শিশুর মধ্যে ১৩ জনের বয়স ৬ মাসের কম, ৬ থেকে ৯ মাস বয়সী মৃত শিশুর সংখ্যা ৫ জন। ৯ মাস বয়সের উপরে শিশুর সংখ্যা ৬ জন। অর্থ্যাৎ আক্রান্ত মৃতদের মধ্যে ৬ মাসের নিচের শিশুদের মৃত্যুর হার প্রায় ৫৪ শতাংশ। একই সময়ের হাম উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা ১ হাজার ৫৩৯ জন শিশুর একটি তালিকা এসেছে সমকাল প্রতিবেদকের হাতে। এই তালিকায় দেখা যায়, হাম উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত ১৫৩৯ জনের মধ্যে ২৯২ জন শিশু ৬ মাসের কম বয়সী।

এই তালিকাটি হাতে পাওয়ার আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডা. একেএম শাহাব উদ্দীন বলছিলেন, মৃত ও আক্রান্ত শিশুদের অধিকাংশেরই টিকা পাওয়ার বয়স ৬ মাস হয়নি। আগে টিকার পাওয়ার বয়স ছিল ৯ মাস। হাম মহামারি আকারে ছড়ালে তা কমিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় আনা হয় ৬ মাসে। যেহেতু আক্রান্ত শিশুরা নবজাতক থেকে শুরু করে ৬ মাসের মধ্যে বেশি তাহলে টিকা পাওয়ার বয়স আরও কমানো যায় কিনা জানতে চাইলে সিভিল সার্জন একেএম শাহাব উদ্দীন বলেন, ‘এটা আমাদের সিদ্ধান্ত নয়, এই সিদ্ধান্ত সরকারের উচ্চ পর্যায়ের।’ তিনি বলেন, ‘৬ মাসের কম বয়সী শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুবই কম। আক্রান্ত হলে তাদের মৃত্যুঝুঁকি খুবই বেশি। তাদের মৃত্যু বেশি হচ্ছে।’

রামেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন গোদাগাড়ীর কামারপাড়া গ্রামের রোজিনা এসেছেন ৬ মাসের শিশু হালিমাতুস সাদিয়াকে নিয়ে। তিনি বলেন, ‘আমার বাচ্চার বয়স ৬ মাস পূর্ণ হয়নি। তাই হামের টিকা পায়নি। এখন বাচ্চাদের ৬ মাসের আগেই হাম হয়ে যাচ্ছে। সব বাবা-মা চায় তাদের সন্তান ভালো থাকুক- সুস্থ্য থাকুক। আমরা চাই ৬ মাসের আগেই বাচ্চাদের টিকা দেওয়া হোক। ’ সাকিল মাহমুদ তার চার মাস বয়সী সন্তান ফারিসতা নূরকে নিয়ে শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। তিনি বলেন, ‘আমি ভাবতেও পারিনি, চার মাস বয়সে আমার বাচ্চার হাম হয়ে যাবে। সরকারিভাবে বলা হয়েছিল- কোন বাচ্চা ৬ মাসের আগে হামের টিকা পাবে না। অথচ ৬ মাসের আগেই হামে আক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। এখানে আমার বাচ্চার জীবন গেলে কে দায়ী থাকবে? জন্মের পরপরই যদি বাচ্চা টিকা পেত তাহলে তার এতটা ঝুঁকি হতো না। জন্মের পরপরই বাচ্চাদের হামের টিকা দেওয়ার দাবি জানাই।’

সন্তান সানজিদকে নিয়ে নওগাঁর পোরশা থেকে রামেক হাসপাতালে এসেছেন সোহেল রানা। ২৫ দিন ধরে হাসপাতালের বেডে সানজিদ চিকিৎসাধীন। বাবার চোখে-মুখে ক্লান্তি। নানা পরীক্ষা আর আর ওষুধ কিনতে কিনতে হাঁপিয়ে উঠেছেন। জানান, প্রথমে নওগাঁর পোরশা হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার হাম হয়েছে বলে জানান। এরপর অবস্থা খারাপ হলে রামেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করেন। টানা ২৫ দিন ধরে এখানে চিকিৎসা চলছে। নিউমোনিয়া, ফুসফুসে ইনফেকশনসহ নানা জটিলতা। তিনি বলছেন, ‘বাচ্চার টিকার বয়স ৬ মাস হয়নি। হামের টিকা যদি সরকার ৬ মাসের আগে দিত তাহলে এতটা কষ্ট আমাদের হতো না।’ 

২০২৫ সালের জুন ও চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে শিশুদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর নির্ধারিত ডোজ দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান। এ সময় সংকট ছিল হামের টিকারও। জানতে চাইলে ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘পুষ্টিহীনতায় ভোগা শিশুরা হাম আক্রান্ত হলে তাদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি। আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় ভিটামিন এ ক্যাপসুল খুবই কার্যকর। যেসব শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে- তাদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি ও ভোগান্তি কমে আসছে।’ তিনি বলেন, ‘বিগত সময়ে টিকার কিছু সংকট ছিল। এছাড়া গত বছরের জুনে এবং চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের ভিটামিন এ ক্যাপসুল শিশুরা পায়নি। সে সময় ভিটামিন এ ক্যাপসুল সরবরাহ ছিল না। এ কারণে শিশুদের ঝুঁকি বেড়েছে। তবে এখন ভিটামিন এ ক্যাপসুল শিশুদের খাওয়াতে সরকারিভাবে নির্দশনা দেওয়া হয়েছে।’

যা বলছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা

রামেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. সাহিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘৬ মাসের নিচে অনেক শিশুই হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত ও মারা যাচ্ছে। তবে আমার জানামতে, বিশ্বের কোথাও ৬ মাসের নিচের শিশুদের টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। এ সময় মায়ের বুকের দুধ পান করাতে হবে। মায়ের কাছ থেকেই শিশু প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাবে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ডা. জাওয়াদুল হক বলেন, ‘৬ মাস পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ পান করেই শিশুরা মায়ের কাছ থেকে এন্ট্রিবডি পায়। এর আগে হামের টিকা দিলে টিকা ভালোভাবে কাজ করবে না। এন্ট্রিবডি ঠিকমতো তৈরি হবে না।’

যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে- তারা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শিশুদের পুষ্টির দিকে নজর দিতে হবে। এর সঙ্গে বাচ্চারা যেন ভিটামিন এ ক্যাপসুল পায় সেদিকে নজর রাখতে হবে। এ ক্যাপসুল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাঝে টিকা এবং ক্যাপসুলের যে ঘাটতি ছিল এটা করা যাবে না। এই ঘাটতির কারণে হাম এতটা মহামারি আকারে ছড়িয়েছে। তবে আবারও নিয়মিত টিকা ও ভিটামিন এ ক্যাপসুল পেলে এই মহামারি কেটে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘গর্ভকালীন মাকে সঠিক যত্ন নিতে হবে। সঠিক পুষ্টি ও ভ্যাকসিন দিতে হবে। ৬ মাস পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মায়ের পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে।’ সূত্র: যুগান্তর

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট