|

বেকার যুবকদের ৩২% উচ্চশিক্ষিত

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে সপ্তম হলেও আয়তনে ৯১তম অবস্থানে থাকা দেশটি বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ রাষ্ট্র। ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল প্রায় চার কোটি ৪০ লাখ; ১৯৭১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় সাত কোটিতে। স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে জনসংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৮ কোটিতে পৌঁছেছে। কিন্তু এই বিপুল জনসংখ্যার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় বেকারত্ব ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) দেশে বেকারত্বের হার বেড়ে ৪.৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩.৯৫ শতাংশ। একই অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই- সেপ্টেম্বর) এই হার ছিল ৪.৪৯ শতাংশ। রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা তৈরি হওয়াও এই বৃদ্ধির একটি কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ৫০ হাজার, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ লাখে। একই সময়ে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ৪.১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪.৪৮ শতাংশ হয়েছে। আরো উদ্বেগজনক হলো- শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হারও কমছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে এটি ৫০.২৭ শতাংশ থেকে কমে ৪৮.৪১ শতাংশে নেমে এসেছে, যার প্রধান কারণ নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ হ্রাস। ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে মোট পাঁচ কোটি ৮৯ লাখ ৩০ হাজার শ্রমশক্তির মধ্যে কর্মসংস্থানে ছিল পাঁচ কোটি ৬২ লাখ মানুষ- যা আগের বছরের তুলনায় কম। অর্থাৎ, কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না।

বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো যুব বেকারত্ব। বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রায় ১৯.৪ লাখ যুবক বেকার ছিল, যা যুব শ্রমশক্তির ৭.২ শতাংশ। এর মধ্যে ৩১.৫ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত। ২০২৪ সালে স্নাতক পর্যায়ের বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩.৫ শতাংশ- যা প্রমাণ করে, উচ্চশিক্ষা অর্জন করেও কর্মসংস্থান নিশ্চিত হচ্ছে না। বাস্তবতা হলো- শিক্ষার স্তর যত বাড়ছে, বেকার থাকার ঝুঁকিও তত বাড়ছে।

গত তিন দশকে সরকার ও উন্নয়ন অংশীদাররা কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং দক্ষতা উন্নয়নে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, জাতিসঙ্ঘ, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও প্রত্যাশিত ফল এখনো অর্জিত হয়নি।

জাতিসঙ্ঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) স্টেট অব ওয়ার্ল্ড পপুলেশন ২০২৫ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ কর্মক্ষম মানুষ রয়েছে (১৫-৬৪ বছর বয়সী), যা মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। অর্থনীতির ভাষায় এটি ‘জনমিতিক মুনাফা’-যা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো দক্ষতা উন্নয়ন ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের মাধ্যমে এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশও বর্তমানে একই সম্ভাবনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। তবে যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন না হলে এই সম্ভাবনা বেকারত্বের চাপেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে সরকার মানবশক্তিকে মানবসম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি শূন্য পদে নিয়োগ, বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সার্ভিস রুল, পেনশন ব্যবস্থা এবং বেকারভাতা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, পাশাপাশি হাইটেক পার্ক ও আইসিটি অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া আগামী পাঁচ বছরে দুই লাখ ফ্রিল্যান্সারকে আইডি কার্ড প্রদান, হাজার হাজার তরুণকে আইটি প্রশিক্ষণ, এআই, ডাটা অ্যানালাইটিক্স ও সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে ‘পেপ্যাল’ চালুর উদ্যোগও ফ্রিল্যান্সিং খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। সূত্র: নয়া দিগন্ত

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

Similar Posts