আসছে কোয়ান্টাম ব্যাটারি

আসছে কোয়ান্টাম ব্যাটারি

স্মার্টফোন থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি- বর্তমান বিশ্বের প্রতিটি পদক্ষেপে শক্তি জোগাচ্ছে ব্যাটারি। কিন্তু লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির সীমাবদ্ধতা আমাদের সবার জানা। চার্জ হতে দীর্ঘ সময় লাগা এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধারণক্ষমতা কমে যাওয়া এক বড় সমস্যা। এই সমস্যার সমাধানে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি ব্যাটারির, যা মুহূর্তে চার্জ হবে এবং যার স্থায়িত্ব হবে অবিশ্বাস্য। সেই স্বপ্ন এখন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে ‘কোয়ান্টাম ব্যাটারি’র হাত ধরে। গবেষকরা সম্প্রতি বিশ্বের প্রথম কার্যকরী কোয়ান্টাম ব্যাটারির প্রটোটাইপ প্রদর্শন করেছেন, যা শক্তির সঞ্চয় ও ব্যবহারের সংজ্ঞাই বদলে দিতে পারে। ইন্টারনেট থেকে তথ্য নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন আজহারুল ইসলাম অভি

কোয়ান্টাম ব্যাটারির মূল ভিত্তি হলো কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অদ্ভুত সব নিয়ম। সাধারণ ব্যাটারি যেখানে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি সঞ্চয় করে, কোয়ান্টাম ব্যাটারি সেখানে শক্তি ধারণ করে অণু-পরমাণুর স্তরে। এর সবচেয়ে বড় চমক হলো ‘সুপার অ্যাবজরপশন’ ক্ষমতা। সাধারণ ব্যাটারির ক্ষেত্রে দেখা যায়, ব্যাটারি যত বড় হয়, চার্জ হতে তত বেশি সময় লাগে। কিন্তু কোয়ান্টাম ব্যাটারির ক্ষেত্রে বিষয়টি ঠিক উল্টো। এখানে ব্যাটারি যত বড় হবে বা এতে যত বেশি কোয়ান্টাম ইউনিট থাকবে, এটি তত দ্রুত চার্জ হবে। অর্থাৎ একটি বড় কোয়ান্টাম ব্যাটারি একটি ছোট ব্যাটারির চেয়েও দ্রুত চার্জ হতে সক্ষম।

আবিষ্কারক ও গবেষণার প্রেক্ষাপট : এই বৈপ্লবিক প্রযুক্তির মূলে রয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইতালির ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির একদল গবেষক। প্রধান গবেষক ড. জেমস কোয়াচ এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২০২২ সালের শুরুর দিকে এর প্রাথমিক প্রটোটাইপ সফল হলেও ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে এর উন্নত সংস্করণগুলো চূড়ান্তভাবে পরীক্ষার টেবিলে সফল প্রমাণিত হয়।

পরীক্ষা চালানো হয়েছে যেখানে : এই ব্যাটারির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাটি চালানো হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষায়িত ল্যাবে। সেখানে গবেষকরা অর্গানিক সেমিকন্ডাক্টিং পলিমার ব্যবহার করে একটি বিশেষ ক্যাভিটি বা প্রকোষ্ঠ তৈরি করেন। এর ভেতরে কোয়ান্টাম স্তরে আলোকে শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করে ব্যাটারিটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়।

এটি যেভাবে কাজ করে : সাধারণ লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি চার্জ হয় এক-একটি কণা বা অণু আলাদাভাবে চার্জ হওয়ার মাধ্যমে। অর্থাৎ ব্যাটারি যত বড় হয়, চার্জ হতে তত বেশি সময় লাগে। কিন্তু কোয়ান্টাম ব্যাটারি কাজ করে কোয়ান্টাম এন্টারঙ্গেলমেন্ট ও সুপার অ্যাবজরপশন নীতিতে।

এর কর্মপদ্ধতি অনেকটা এ রকম : সমষ্টিগত শক্তি : কোয়ান্টাম স্তরে সব কণাগুলো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত বা ‘এনট্যাঙ্গেলড’ থাকে।

গতিময়তা : এর ফলে ব্যাটারির আকার যত বড় হয় এবং অণুর সংখ্যা যত বৃদ্ধি পায়, চার্জ নেওয়ার গতিও ততগুণ বেড়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, যদি একটি সাধারণ ব্যাটারি চার্জ হতে ১ ঘণ্টা সময় নেয়, তবে এর চেয়ে বড় একটি কোয়ান্টাম ব্যাটারি হয়তো মাত্র ১ সেকেন্ডে চার্জ হয়ে যাবে।

বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও এর প্রভাব : কোয়ান্টাম ব্যাটারির এই সফল পরীক্ষা জ্বালানি খাতে কয়েকটি বিশাল দ্বার উন্মোচন করেছে-

১. তাৎক্ষণিক চার্জিং : ইলেকট্রনিক ডিভাইস যেমন স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ সেকেন্ডের মধ্যেই চার্জ হবে। এতে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে এবং মানুষের কর্মঘণ্টা বাড়বে।

২. বৈদ্যুতিক গাড়ির (ঊঠ) যুগ : বর্তমানে বৈদ্যুতিক গাড়ির সবচেয়ে বড় বাধা হলো চার্জিং সময়। কোয়ান্টাম ব্যাটারির ফলে একটি গাড়ি পেট্রোল পাম্পে তেল নেওয়ার চেয়েও কম সময়ে পূর্ণ চার্জ হয়ে যাবে।

৩. পরিবেশবান্ধব জ্বালানি : এই ব্যাটারিতে লিথিয়ামের মতো কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিকের দহন ঘটে না, ফলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার কোনো ভয় নেই। এর স্থায়িত্বও সাধারণ ব্যাটারির চেয়ে অনেক বেশি।

৪. মহাকাশ গবেষণা : সৌরশক্তিকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বিশাল আকারে সঞ্চয় করে রাখার ক্ষমতার কারণে এটি মহাকাশ অভিযানে নতুন প্রাণ সঞ্চার করবে।

যদিও কোয়ান্টাম ব্যাটারি বাণিজ্যিকভাবে সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছাতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে, তবে এর সফল পরীক্ষা নিশ্চিত করেছে যে, আমরা এক নতুন জ্বালানি যুগের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। যেখানে চার্জ ফুরিয়ে যাওয়া বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্লাগ পয়েন্টের পাশে বসে থাকার দিন হবে সুদূর-অতীত।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *