পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনে দূরদর্শিতা কাম্য
বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে এক ঘটনাবহুল ও বিতর্কিত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা-বিশেষত হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা এবং সম্প্রতি শনাক্ত হওয়া অটোনমিক নিউরোপ্যাথির কারণ দেখিয়ে শুক্রবার তিনি স্পিকারের কাছে সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পদত্যাগপত্র দাখিল করেন। জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ সেই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। বলাবাহুল্য, দেশের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই পদত্যাগ এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক নির্দেশ করে।
রাষ্ট্রপতি হিসাবে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের পুরো মেয়াদকালই ছিল নানা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ও বিতর্কে মুখর। ২০২৩ সালের এপ্রিলে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনেকটা হঠাৎ করেই দেশের সর্বোচ্চ পদটিতে তার আসীন হওয়া থেকে শুরু করে পরবর্তী বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে তিনি আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে ছিলেন। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রতি আনুগত্যের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত বক্তব্য এবং বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র সংক্রান্ত তার পরস্পরবিরোধী বিবৃতি রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিল। একদিকে তিনি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সরকারের আমলে নির্বাচিত হয়েও পরবর্তীকালে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন বলে তার সমর্থকদের অভিমত; অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বিরোধী দলগুলোর দাবি ছিল-তার বক্তব্য ও আচরণে রাষ্ট্রপতির পদের নিরপেক্ষতা ও ভাবমূর্তি ভীষণভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। তবে ব্যক্তি সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে যে বিতর্কই থাক না কেন, প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই রূপান্তর প্রক্রিয়ার সুশৃঙ্খল সমাপ্তি অত্যন্ত জরুরি ছিল। পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাংবিধানিক সংকট এড়াতে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আপিল বিভাগের মতামত গ্রহণ এবং পরবর্তীকালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন ও নির্বাচন পরিচালনায় তিনি ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, চরম উত্তাল পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে তার অবস্থান দেশকে বড় ধরনের সাংবিধানিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে সহায়ক হয়েছে। বর্তমানে সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। স্পিকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ এবং সংসদ সচিবালয়ের দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কাজের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা হয়েছে, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক।রাষ্ট্রপতির পদটি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের বিদায়ের পর এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব এসে পড়েছে জাতীয় সংসদের ওপর-একজন সর্বজনগ্রাহ্য, নিরপেক্ষ ও সাংবিধানিক মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তিত্বকে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত করা। আমরা মনে করি, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে অতীত বিতর্ক থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একজন রাষ্ট্রপ্রধান উপহার দিতে হবে, যিনি দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে সাংবিধানিক কাঠামোর সুরক্ষা প্রদান করবেন এবং গণপ্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ পদের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখবেন।
