হাসিনাকে নিয়ে বেকায়দায় ভারত
খোদ ভারতীরাই বলতে শুরু করেছেন হাসিনাকে দিল্লিতে রেখে বাংলাদেশে কেন আমরা ভারত বিদ্বেষের চাষ করব। কেন্দ্রীয় সরকার যদি ভারত থেকে অবৈধ বাংলাদেশীদের বিতাড়িত করতে চায় তাহলে শেখ হাসিনাকে দিয়েই সেটা শুরু করা উচিত। বিক্ষুব্ধ ভারতীয়দের প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের করের টাকায় বাংলাদেশ থেকে গণ-অভ্যুত্থানে জনগণের রোষানল থেকে পালিয়ে আসা প্রধানমন্ত্রীকে ভরণপোষণ করে কেন আমরা বাংলাদেশী পর্যটক হারাব। এর জন্য কেন হাজার হাজার কোটি রুপি লোকসান দিতে হবে। ভারতীয় কলামিস্ট মহুয়া গগৈ তার কলামে লিখেছেন যেভাবে শুভেন্দু অধিকারীরা বাংলাদেশীদের মনে ভীতি সঞ্চারের চেষ্টা করেছেন তাতে ভিসা চালু হলেও কাক্সিক্ষত বাংলাদেশী পর্যটক পাওয়া বেশ কঠিনই হবে।
পরিস্থিতি আরো বেকায়দায় দাঁড়িয়েছে তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরের পর। ২০১৫ সালের মধ্যে মোংলা বন্দরে ভারতীয় বিনিয়োগ চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়ার কথা থাকলেও দিল্লি তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো বাংলাদেশে সোনাদিয়া বন্দরে চীনা বিনিয়োগ আসতে দেয়নি ভারত। তিস্তা চুক্তি বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। গঙ্গা চুক্তি নবায়নের সময় চলে এসেছে। অথচ সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যা বন্ধ হয়নি। নতজানু পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে গিয়ে কোন দেশের সাথে কি ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলবে তার জন্য দিল্লির অপেক্ষায় বসে নেই ঢাকা। এরই প্রেক্ষাপটে ঢাকাকে চাপে ফেলতে দিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফ পর্যায়ে সীমান্ত সম্মেলন হওয়ার পরও পুশইন অব্যাহত রেখেছে ভারত। কিন্তু ঢাকাও বসে নেই। চীন সফরের পর সৌদি আরবের প্রিন্স বিন সালমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তার দেশে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বাংলাদেশ চীন, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, তুরস্কসহ কোন দেশের সাথে কিভাবে সম্পর্ক গড়ে তুলবে তার জন্য দিল্লির পরামর্শ বা কোনো প্রয়োজনের তোয়াক্কা করছে না। ২৪-উত্তর বাংলাদেশের এ ধরনের বিস্ময়কর পরিবর্তন দেখেও ভারত এখনো তার বাংলাদেশ নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনার প্রয়োজন মনে না করে উল্টো অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। এ প্রেক্ষাপটেই এ বছরেই হাসিনা দেশে ফিরবেন এমন ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
ভারতীয়দের পরিচালনায় ইউটিউব চ্যানেলগুলোতে একসময়ের বিবিসিখ্যাত সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক ও প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়ার সভাপতি গৌতম লাহিড়ী বিভিন্ন সময়ে বাতলে দিচ্ছেন কিভাবে বাংলাদেশে হাসিনা ফিরবেন, কিভাবে তার দলের নেতাকর্মীরা সংগঠিত হচ্ছেন, প্রবাসী আওয়ামী লীগাররা কিভাবে হাসিনার সাথে শলাপরামর্শ করে আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করছে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি মোটেই ভালো নয়, ইউনুস সরকারের রেখে যাওয়া রাজনৈতিক দর্শনই অনুসরণ করে চলেছে নির্বাচিত সরকার ইত্যাদি। এ ধরনের অপপ্রচারের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের টেলিভিশন টকশো ও বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেলে আওয়ামী লীগের প্রাসঙ্গিকতা তৈরির চেষ্টা চলছে। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমলে শেখ হাসিনার কাছের ও চাটুকার সাংবাদিক হিসেবে পরিচিতজনরা বলতে শুরু করেছেন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে বয়ান দিচ্ছেন তারা। শেখ হাসিনা যে গুম খুন করে জনরোষে গণ-অভ্যুত্থানে ভারত পালিয়ে গেছেন একথা মুখেও আনছেন না তারা। তাদের কথায় মনে হয় রাজনৈতিক কোনো জটিলতায় হাসিনা ভারতে আটকে আছেন এবং তারা আভাস দিচ্ছেন হাসিনা দেশে শিগগিরই ফিরছেন। হাসিনা ফিরে আসার এসিড টেস্ট হিসেবে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় বা প্রতীকবিহীন নির্বাচনে অংশ নেয়ার সম্ভাবনাকে ইনিয়ে বিনিয়ে উপস্থাপন করছেন তারা। তারা বলছেন সংসদে কার্যত কোনো বিরোধী দল নেই। বিরোধীদলের ভূমিকা রাজপথেও পালন করতে পারছে না জামায়াত। ‘আসলি’ বিরোধীদল হিসেবে আওয়ামী লীগকেই প্রয়োজন। তাই আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে।
সাংবাদিক গৌতম লাহিড়ী ও সুবীর ভৌমিকের ভাষায় হাসিনা দিল্লিতে তো আর বসে থাকেননি। এনডিটিভিতে হাসিনার সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থাপনার সাথে নিজের জড়িত থাকার কথা খোলাখুলি স্বীকার করছেন সুবীর। তারা বলছেন, হোয়াটস অ্যাপ ও ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে হাসিনা গত দুই বছরে বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের পুনর্গঠিত করেছেন। এরই মধ্যে ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের কাজ সুচারুরূপে শেষ করার পর যুবলীগের কমিটি গঠনের কাজে হাত দিয়েছেন। ভারতে আশ্রিত আওয়ামী নেতাকর্মীদের দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিতে বলেছেন হাসিনা। সাড়াও পেয়েছেন প্রচুর। আওয়ামী সমর্থক যুবকরা খালি হাতে বাংলাদেশে ফিরবে না বলে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের উদাহরণও টেনেছেন সুবীর। এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের দিল্লিতে আওয়ামী লীগের দাফন হয়ে গেছে এমন বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে খিস্তিখেউড় আউড়াতে ভুল করছেন না এই দুই ভারতীয় সাংবাদিক। সালাউদ্দিন আহমেদকে ‘হরিদাস পাল’ সম্বোধন করে ওপেন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলা হচ্ছে বাপের বেটা হলে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে নির্বাচন দিয়ে দেখ বিএনপির ২১৩ সিট ২১ শে নামে কি না। সূত্র: মানব জমিন
