রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জামানায় মুনাফিকদের অপতৎপরতা
মোহাম্মাদ মাকছুদ উল্লাহ
মানব সমাজের সব থেকে অভিশপ্ত শ্রেণির নাম, মুনাফিক। এরা একক কোন সমাজ বা শ্রেণির জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং মানব সভ্যতার নিকৃষ্টতম শত্রু হলো মুনাফি শ্রেণির মানুষগুলো। এরা সমাজে সাধারণ মানুষের সাথে মিলে মিশে বসবাস করে আর ভিতরে ভিতরে সমাজের ক্ষতি ও ধ্বংস সাধনের অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকে। এরা বিশেষ করে ইসলাম ও মুসলমানদের চিরশত্রু। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগেও মুনাফিকের সংখ্যা একবারে কম ছিল না। তবে রাসূল (সা.)-এর সম্পর্ক যেহেতু সরাসরি আল্লাহর সাথে ছিল, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বর্ণচোরা মুনাফিকদের বিষয়ে স্বীয় রাসূল (সা.)-কে জানিয়ে দিতেন। তাই রাসূল (সা.) তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলিতে কৌশলি সিদ্ধন্ত গ্রহন করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যামানার মুনাফিকদের অন্যতম ছিল, আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল, যে রইসুল মুনাফিকীন বা মুনাফিক সর্দার হিসেবে ইতিহাসে খ্যাত। আরো ছিল জুলাস ইবনে সুয়াইদ, মুয়াত্তিব ইবনে কুশাইর, নাবতাল ইবনে হারিস, বিশর ইবনে উবাইরিক, ওয়াদিয়াহ ইবনে সাবিত, জাদ্দ ইবনে কাইস, আব্দুল্লাহ ইবনে নাবতাল, থালাবাহ ইবনে হাতিব, আবু আমির আর-রাহিব, অপ্রকাশিত আরো অনেকে।
মুনাফিকদের অপতৎপরতাঃ মুনাফিকরা নিজেদেরকে মুসলমান পরিচয় দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে বিভিন্ন ধরণের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতো এবং রিপাদে থেকে ইসলাম ও মুসলমানদের ক্ষতি সাধনে সব সময় বিভিন্ন ধরণের অপতৎপরতায় লিপ্ত থাকতো। তারা মনে করতো রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের এসব অপকর্ম সম্পর্কে কখনো জানতে পারবেন না। কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বীয় হাবীব (সা.)-কে মুনাফিকদের সকল প্রকার ষঢ়যন্ত্র সম্পর্কে আগাম সংবাদ প্রদান করতেন। আর রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের অপকর্ম সম্পর্কে অজ্ঞতার বাহ্যাবরণে থেকে কৌশলে নিজের সকল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতেন। আমরা নিবন্ধের সংক্ষিপ্ত কলেবরে ইসলাম ও মুসলমানদের ক্ষতি সাধনে মুনাফিকদের অপতৎপরতা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।
মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক বিভেদ সৃষ্টিঃ মুনাফিকদের প্রধান কাজ ছিলো মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ ও বিভেদ সৃষ্টি করে মুসলিম ঐক্যকে দুর্বল করে ফেলা। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন। “আর মানুষের মধ্যে কিছু লোক এমন আছে যারা বলে, আমরা আমরা আল্লাহ ও পরকালের উপর ঈমান এনেছি অথচ প্রকৃত প্রস্তাবে তারা আদৌ ঈমানদার নয়। তারা আল্লাহ এবং ঈমানদারদেরকে ধোকা দিতে চায়, আসলে তারা নিজেদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে ধোকা দেয় না, অথচ তারা তা বুঝতে পারে না।”(সূরা আল-বাক্বারাহ: ৮-৯)
যুদ্ধের সময় বিশ্বাস ঘাতকতা করাঃ মুনাফিকরা যেহেতু ইসলাম ও মুসলমানদের বিনাশ সাধনের চেষ্টাতেই সব সময় রত থাকতো, তাই মুসলমানরা কাফিরদের বিরুদ্ধে জয় লাভ করুক, এটা কিছুতেই তারা চাইতো না। আর সে কারণে যখনই মুসলমানদের সাথে কাফির সম্প্রদায়ের কোন যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবি হয়ে পড়তো, তখন তারা এমনভাবে বিশ্বাস ঘাতকতা করতো যাতে মুসলমানদের মনোবল ভেঙ্গে যায়, তাঁরা দুর্বল হয়ে পড়ে আর এই সুযোগে কাফিররা বিজয় লাভ করে। এর একটি উজ¦ল উদাহরণ হলো ওহুদ যুদ্ধের সময় মুনাফিক সরদার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর প্রায় তিনশত সৈন্য নিয়ে মুসলিম বাহিনী ফেকে ফিরে আসা। মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন,“এবং তাদেরকে যেনো সনাক্ত করা যায়, যারা মুনাফিক ছিলো। আর তাদেরকে বলা হলো এসো, আল্লাহর রাহে লড়াই করো কিংবা শত্রুদেরকে প্রতিহত করো। তারা বললো, আমরা যদি জানতাম যে, লড়াই করতে হবে, তাহলে অবশ্যই আমরা তোমাদের সাথে থাকতাম। সেদিন তাদের অবস্থান ঈমানের বিপরিতে কুফরির কাছাকাছি ছিলো। যা তাদের অন্তরে নেই মুখে তারা সে কথাই বলে বস্তুতঃ তারা যা কিছু গোপন করে সে বিষয়ে আল্লাহ ভালো করেই জানেন। ওরা হলো ওইসব লোক যারা বসে থেকে নিজেদের ভাইদের সম্পর্কে বলে, যদি তারা আমাদের কথা শুনতো, তাহলে তারা মারা যেত না। তাদেরকে বলে দিন, এবার তোমরা নিজেদের উপর থেকে মৃত্যুকে সরিয়ে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো।” (সূরা আলে ইমরান: ১৬৭-১৬৮)
গুজব ছড়ানোঃ মুসলিম সমাজে বিভক্তি, দ্বন্দ-সংঘাত সৃষ্টির জন্য মুনাফিকদের অন্যতম প্রধান অপকর্ম ছিল, মিথ্যা গুজব রটনা করা। রাসূল (সা.) এর প্রিয়তমা স্ত্রী, উম্মাহাতুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর বিরুদ্ধে ব্যাভিচারের অপবাদ ছড়িয়ে তারা ইতিহাসের জঘণ্যতম গুজবি হাতিয়ারটি ব্যবহার করেছিল। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নূরের ১১ ও ১২ আয়াত নাযিল করে হযরত আয়েশা (রা.)-কে নির্দোষ ঘোষণা করেন।
মসজিদে দ্বিরার প্রতিষ্ঠাঃ মুনাফিকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষঢ়যন্ত্র পরিকল্পনা গ্রহন ও বাস্তবায়নের জন্য নিজেদের নিরাপদ বৈঠকখানা হিসেবে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা আত-তাওবার ১০৭-১১০ আয়াত নাযিল করে ইসলাম ও মুসলমানদের ক্ষতি সাধনের কুমতলবে প্রকিষ্ঠিত এ মসজিদ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য রাসূল (সা.) জানিয়ে দেন এবং সেখানে তাঁকে নামায আদায় করতে নিষেধ করেন। এগুলো ছাড়াও মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে জিহাদে অংশ গ্রহন থেকে বিরত থাকা, বিভিন্ন কৌশলে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে কষ্ট দেয়া, ইসলামের জন্য অর্থের প্রয়োনে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবাদেরকে সামর্থ অনুযায়ী দান করতে আহবান করলে, তারা দান করতে সরলমনা মুসলমানদেরকে নিরুৎসাহিত করতো, ইসলামের শত্রুদের সাথে মুনাফিকরা গোপনে যোগাযোগ রক্ষা করতো এবং তাদেরকে সহযোগিতা করতো, তারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যার করার ষঢ়যন্ত্রও করেছিল। মোট কথা মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জামানায় ইসলাম ও মুসলমনাদের ক্ষতি সাধনে বিভিন্ন ধরণের অপতৎপরতায় লিপ্ত ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় আজও মুসলিম নামধারি মুনাফিকরা ইসলাম ও মুসলমানদের বিনাশ সাধনে বিভিন্ন ধরণের অপতৎপরতায় লিপ্ত আছে। আসলে কাফিরদের চেয়ে মুনাফিকরাই ইসলামের বড় শত্রু।
লেখক: পেশ ইমাম ও খতীব, রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ।
