রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর

কয়েকটি চুক্তি নিষ্পন্ন হয়নি, বিদ্যুতের দাম ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অমীমাংসিত ঝুঁকি নিয়ে চালু হচ্ছে রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র           

জ্বালানি সংকটের এই সময়ে দেশের সবচেয়ে বড় ভরসা হতে পারে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। সরকারের প্রত্যাশা, আসছে আগস্ট মাসের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। তবে উৎপাদন শুরুর আগমুহূর্তেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। এখনও হয়নি ঝুঁকিপূর্ণ স্পেন্ট ফুয়েল অপসারণের চূড়ান্ত চুক্তি। নির্ধারিত হয়নি বিদ্যুতের দাম। বাকি রয়েছে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ-সংক্রান্ত সমঝোতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে শুধু রিঅ্যাক্টরে জ্বালানি লোড বা বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করাই একমাত্র সফলতা নয়; বরং এর দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উপযোগিতা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই আসল চ্যালেঞ্জ।

আর্থিক বিবেচনায় দেশের একক বৃহত্তম এই প্রকল্প নির্মাণে আর্থিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা করছে রাশিয়া। প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পের ৯০ শতাংশ অর্থ ঋণ দিচ্ছে রাশিয়া, যা ২৮ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। রুশ প্রতিষ্ঠান রোসাটমের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এই নির্মাণকাজ চলছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, বেশ কিছু অতিগুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরীক্ষামূলক উৎপাদনে যাচ্ছে। ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি (স্পেন্ট ফুয়েল) মানবদেহ ও পরিবেশের জন্য ব্যাপক ঝুঁকিপূর্ণ। এই ক্ষতিকর বর্জ্য রাশিয়া পুনর্ব্যবহারের জন্য ফেরত নিয়ে যাবে, নাকি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করবে–সে বিষয়টি এখনও অস্পষ্ট। পাশাপাশি এই প্রক্রিয়ার ব্যয়ভার কেমন হবে– তাও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) চূড়ান্ত না হওয়ায় বিদ্যুতের দাম নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। কেন্দ্রটির পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রস্তাবিত ‘ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ গঠনের প্রক্রিয়াটি এখনও অমীমাংসিত।

এই নিউক্লিয়ার বিশেষজ্ঞের মতে, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতের স্বার্থে এই চুক্তিগুলো অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। এখন তাড়াহুড়ো করে এগুলো করলে দীর্ঘ মেয়াদে ইতিবাচক ফল নাও আসতে পারে। তাই বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগেই চুক্তিগুলো সম্পাদন করে এর শর্তাবলি জনগণের সামনে উন্মুক্ত করা জরুরি। গ্রিড ফ্রিকোয়েন্সি ওঠানামার ঝুঁকি এড়াতে রূপপুর কর্তৃপক্ষ ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে রিয়েল-টাইম সমন্বয় প্রয়োজন। তবে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাছান বলেন, ‘আমাদের মূল ফোকাস এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন। দক্ষ জনবলের অভাব থাকায় সব কিছু একসঙ্গে করতে গেলে কোনোটিই মানসম্মত হবে না। তবে ফুয়েল নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চুক্তি আছে এবং ব্যবস্থাপনা চুক্তির কাজও অনেক দূর এগিয়েছে।’ রাষ্ট্রীয় দুই কোম্পানির বিষয় হওয়ায় পিপিএ নিয়েও তিনি চিন্তিত নন। তিনি জানান, কোনো ঘাটতি থাকলে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) অনুমতি ছাড়া বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব নয়, তাই উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে আগামী মাসের শেষ নাগাদ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নভেম্বরের মধ্যে ইউনিটটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। তবে খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হতে আরও সময় লাগতে পারে।

বিদ্যুতের দাম এখনও অজানা

দেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার আগেই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) মধ্যে পিপিএ সম্পন্ন হতে হয়, যার ভিত্তিতে পাইকারি দাম বা ট্যারিফ নির্ধারিত হয়। তবে রূপপুরের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক উৎপাদন ঘনিয়ে এলেও এই চুক্তি সই হয়নি। পিডিবি প্রকল্পের মোট নির্মাণ ব্যয় ও পরিচালন খরচ চেয়ে বারবার চিঠি পাঠালেও রূপপুর কর্তৃপক্ষের সাড়া মেলেনি। পরমাণু শক্তি কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, পারমাণবিক কেন্দ্রের ট্যারিফ নির্ধারণ প্রক্রিয়া সাধারণ গ্যাস বা কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের চেয়ে জটিল, কারণ এখানে ঋণের কিস্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ডিকমিশনিং ব্যয়ের মতো দীর্ঘমেয়াদি খাত যুক্ত থাকে।

ট্যারিফ চুক্তি না হওয়ায় বিদ্যুতের সম্ভাব্য দাম নিয়ে একেক সময় একেক তথ্য এসেছে। ২০২০ সালে প্রতি ইউনিটের দাম চার থেকে সাড়ে চার টাকা দাবি করা হলেও ২০২৩ সালে সাত থেকে আট টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে আভাস দেওয়া হয়। বর্তমানে শুধু উৎপাদন খরচই ধরা হচ্ছে চার টাকা ৩১ পয়সা। এর সঙ্গে যখন রাশিয়ার ঋণের সুদ, বিদেশি জনবলের পরিচালন ব্যয় এবং উচ্চ তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার খরচ যুক্ত হবে, তখন প্রকৃত দাম জানা যাবে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘আমার কাছে যতটুকু তথ্য-উপাত্ত এসেছে, তাতে রূপপুরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১১-১২ টাকা হতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, পরিবেশের ঝুঁকি বিবেচনায় রূপপুর প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়। পরিবেশবিদরা শুরু থেকেই এই প্রকল্পের বিরোধিতা করে আসছেন। এর মধ্যেও এই প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে রয়েছে নানান প্রশ্ন। তাই দেশের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিলে রূপপুরের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে জাতীয় ঐকমত্য জরুরি। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট