বাংলাদেশ-চীন-পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতায় তিন দিক থেকেই যে বিপদ দেখছে দিল্লি!

ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও সীমান্ত সুরক্ষায় এক নজিরবিহীন ত্রিমুখী সংকটের মেঘ ঘনিয়ে আসছে। একদিকে চীন সীমান্তে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও অনুপ্রবেশের চেষ্টা, অন্যদিকে ভারতের পূর্ব সীমান্তে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও গোয়েন্দা ঘনিষ্ঠতা-সব মিলিয়ে দিল্লির নীতিনির্ধারকদের কপালে এখন চিন্তার গভীর ভাঁজ।

ভারতের সীমান্ত রক্ষা বাহিনী (বিএসএফ) ও নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরোর (এনসিবি) সাবেক মহাপরিচালক এবং দিল্লি পুলিশের সাবেক কমিশনার রাকেশ আস্থানার এক বিশেষ নিবন্ধে এই উদ্বেগের কথা প্রকাশ করা হয়েছে। তার মতে, এই নতুন আঞ্চলিক সমীকরণ ভারতকে তিন দিক থেকেই এক বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।

ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য স্টেটসম্যানে প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়েছে, অরুণাচল প্রদেশ, লাদাখ এবং উত্তরাখণ্ডের দুর্গম চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় বিশাল অর্থ ব্যয়ে রাস্তাঘাট ও দ্বিমুখী ব্যবহারের উপযোগী সামরিক অবকাঠামো নির্মাণে বাধ্য হচ্ছে ভারত সরকার। দুর্গম জীবনযাত্রা ও কর্মসংস্থানের অভাবে সীমান্ত এলাকার ভারতীয় নাগরিকরা শহরমুখী (মাইগ্রেশন) হওয়ায় ওইসব অঞ্চল জনশূন্য হয়ে পড়ছে। আর এই সুযোগটিই নিচ্ছে চীনা লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)। শীতকালে জনশূন্য ভারতীয় ভূখণ্ডে চীনাদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ভারত সরকার ‘ইন্দো-চীন বর্ডার রোড’ (আইসিবিআর) প্রকল্পের আওতায় হাজার হাজার কিলোমিটার সড়ক, হেলিপ্যাড এবং ল্যান্ডিং স্ট্রিপ তৈরি করছে। ‘ভাইব্রেন্ট ভিলেজেস প্রোগ্রাম’-এর নামে স্থানীয় গ্রামবাসীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সীমান্ত পাহারায় নিযুক্ত করা হচ্ছে, যা দিল্লির ভেতরের এক প্রকার চরম অস্থিরতাকেই প্রকাশ করে।

রাকেশ আস্থানার মতে, ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভূতপূর্ব সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা। বিগত কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসিম মালিকের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের দল ঢাকা সফর করেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, পাকিস্তানি এই দল ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত করিডোর ‘চিকেনস নেক’ (শিলিগুড়ি করিডোর) এবং চিটাগং হিল ট্র্যাক্টসের নিকটবর্তী বাংলাদেশের রংপুর জেলা পরিদর্শন করেছে।

এখানেই শেষ নয়, দীর্ঘ ২০ বছর পর পাকিস্তানের আমন্ত্রণে আরব সাগরে যৌথ নৌমহড়া ‘আমান’-এ অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল মোহাম্মদ হাসানের “ভূমি বিভক্ত করে কিন্তু সমুদ্র একত্রিত করে” মন্তব্য এবং পাকিস্তানের পক্ষ থেকে দুই দেশকে “ভাই ভাই” হিসেবে আখ্যা দেওয়ার বিষয়টি দিল্লির কৌশলগত মহলে তীব্র কম্পন তৈরি করেছে। এর ওপর বাংলাদেশ যদি পাকিস্তান থেকে যৌথভাবে তৈরি ‘জেএফ-১৭ থান্ডার’ ফাইটার জেট সংগ্রহ করে, তবে তা দক্ষিণ এশিয়ায় চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশ এক শক্তিশালী ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করবে, যা ভারতকে সম্পূর্ণ কোণঠাসা করে ফেলতে পারে।

ভারতের সাবেক এই শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, কাশ্মীর ও পাঞ্জাবের মতো ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও অশান্তি ছড়াতে পাকিস্তান এখন বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তকে ব্যবহার করতে পারে। মিয়ানমার থেকে ভারতের বাজারে আসা কোটি কোটি টাকার হেরোইন ও মেথামফেটামিনের মতো মাদক চোরাচালানের অর্থ (নার্কো-মানি) উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদী ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র ও রসদ জোগাতে ব্যবহৃত হতে পারে। আসাম ও আশপাশের রাজ্যগুলোতে ভারত সরকার যে জোড়াতালির শান্তি চুক্তিগুলো করেছে, পাকিস্তান ও তার মিত্ররা ভারতের পূর্ব সীমান্তে একটি ‘দ্বিতীয় ফ্রন্ট’ বা নতুন যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করে সেই শান্তি পুরোপুরি নস্যাৎ করে দিতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা, ইসলামাবাদ এবং বেইজিংয়ের এই ত্রিভুজ ঘনিষ্ঠতা দিল্লির আধিপত্যকামী কৌশলের জন্য এক মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন্ধুত্ব ও প্রতিবেশীসুলভ আচরণের পরিবর্তে দাদাগিরির পথ বেছে নেওয়ায় ভারতকে এখন চরম আতঙ্কের মধ্য দিয়ে প্রতিরক্ষামূলক পরিকল্পনা সাজাতে হচ্ছে। সূত্র: ইনকিলাব

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট