| |

আনন্দ–উচ্ছ্বাস আর কৌতূহলে মুখর বইমেলার শিশুপ্রহর

অমর একুশে বইমেলায় আজ শুক্রবার ছিল তৃতীয় শিশুপ্রহর। শিশুপ্রহরে মেলায় আসে নানা বয়সী শিশুরা। কেউ আসে বাবা-মায়ের হাত ধরে, কেউ–বা স্কুলশিক্ষকের সঙ্গে। বইয়ের স্টলে ঘুরে ঘুরে তারা খুঁজে বেড়ায় গল্প, ছড়া, রূপকথা কিংবা বিজ্ঞানভিত্তিক বই। অনেকেই প্রথমবারের মতো বইমেলায় এসে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে সারি সারি বইয়ের দিকে।

তবে শিশুপ্রহরের অন্যতম আকর্ষণ পাপেট শো। বেলা সাড়ে ১১টায় কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের মঞ্চে শুরু হয় এই শো। ছোট ছোট রঙিন পুতুল–পাখির মাধ্যমে বলা হয় নানা শিক্ষণীয় গল্প। এসব গল্পে সততা, বন্ধুত্ব, আবার কখনো পরিবেশ রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরা হয় শিশুদের সামনে।

পাপেটকে গল্প বলতে দেখে উচ্ছ্বাস আর কৌতূহলে মুখর হয়ে ওঠে শিশুরা। গল্প বলার এই অভিনব পদ্ধতি শিশুদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। তারা মঞ্চের সামনে গোল হয়ে বসে মনোযোগ দিয়ে দেখে পাপেট শো।

কখনো হাসিতে ফেটে পড়ে, কখনো আবার গল্পের চরিত্রদের সঙ্গে কথাও বলতে শুরু করে শিশুরা। শিশুদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ পুরো পরিবেশকে করে তোলে প্রাণবন্ত।

শিশুপ্রহরের আয়োজনের মূল লক্ষ্য শুধু বিনোদন নয়, বরং গল্পের মাধ্যমে শেখানো। আয়োজকেরা মনে করেন, বইয়ের প্রতি ভালোবাসা গড়ে তোলার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো শৈশব। তাই ছোটদের বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে, তাদের কল্পনার জগৎকে আরও সমৃদ্ধ করতে এই বিশেষ আয়োজন ভূমিকা রাখছে।

দুপুরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলার পাপেট শোর মঞ্চের সামনে শিশুরা গোল হয়ে বসে শো দেখার জন্য অপেক্ষা করছিল। তখন হঠাৎ মঞ্চে আসে পাপেট আলো। আলো তার আরেক বন্ধু গগলুকে খুঁজছিল। শিশু বন্ধুদের কাছে গগলুর খোঁজ করতেই শিশুরা বলে ওঠে, ‘গগলু তুমি এসো…আমরা তোমার গল্প শুনব।’

তারপর হঠাৎ গগলু মঞ্চে এসে হাজির হয়। তা দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে হাততালি দিতে থাকে শিশুরা। গগলু তখন শিশুদের জন্য বলে ওঠে, ‘আমাদের সঙ্গে বাঘ মামাও এসেছে। তোমরা অপেক্ষা করো।’

অমর একুশে বইমেলার তৃতীয় শিশুপ্রহরে পাপেট শো উপভোগ করছে শিশুরা

গল্প বলতে বলতে গগলু শিশুদের উপদেশ দেয়, ‘তোমরা বই পড়বে, গাছ লাগাবে, বাবা–মায়ের কথা শুনে চলবে, আর মোবাইলে গেমস খেলবে না।’

খিলগাঁও থেকে বইমেলায় পাপেট শো দেখতে আসে শিশু তাইয়েমা হোসেন। তাকে নিয়ে আসেন তার মা তাহরিমা আক্তার।

পাপেট শো দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তাইয়েমা। সে বলে, ‘পাপেট শো দেখে খুব ভালো লাগছে। পুতুলগুলো কথা বলে, গল্প বলে। বেশ মজা লাগছে।’

তাইয়েমার মা তাহরিমা আক্তার জানান, তাঁর মেয়ে টিভিতে পাপেট শো দেখেছে। তারপর থেকে মেলায় আসার জন্য আবদার করছিল। শুক্রবার ছুটির দিন থাকায় মেয়েকে নিয়ে তিনি মেলায় ঘুরতে এসেছেন।

দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া তাইয়েমা বেশ কিছু বই কিনেছে। এর মধ্যে আছে গল্প, রূপকথা ও ভূতের গল্পের বই।

মেলার আজ নবম দিন। প্রতি শুক্র–শনিবার থাকছে শিশুপ্রহর।

শিশুপ্রহরে মেলার দ্বার খোলে বেলা ১১টায়। শিশুপ্রহর থাকে বেলা ১টা পর্যন্ত। এর পর থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা উন্মুক্ত থাকে সবার জন্য। রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত গ্রন্থানুরাগীরা মেলায় আসেন।

কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা আসাদুজ্জামান আশিক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চাই, শিশুরা মোবাইলে গেমস না খেলে বই পড়ুক। মাঠে খেলুক। শিশুরা আনন্দে আনন্দে শিখুক। শিক্ষার মাধ্যম হোক আনন্দদায়ক। এটাই পাপেট শোর উদ্দেশ্য।’

আসাদুজ্জামান আশিক জানান, এবার মেলায় প্রতিদিন পাপেট শো চলছে। আজ প্রদর্শিত হয় ‘বল্টু মামা ও তার সাঙ্গপাঙ্গ’ এবং ‘বন ভ্রমণ’। গল্প পাঠ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক রশীদ হারুন।

অমর একুশে বইমেলার তৃতীয় শিশুপ্রহরে বায়োস্কোপ দেখছে শিশুরা

বায়োস্কোপে শিশুদের ভিড়

কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের পাশেই ছোট একটি বায়োস্কোপ বসানো। শিশুরা উচ্ছ্বাস নিয়ে ভিড় করে বায়োস্কোপের সামনে। ধীরে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল কেউ। বায়োস্কোপে প্রদর্শিত হচ্ছিল কুঁজো বুড়ির গল্প। দেখানো হচ্ছিল একটি রঙিন, শিক্ষণীয় ও হাস্যকর কাহিনি। ছোটরা সেই গল্প চোখ বড় করে দেখছিল।

বায়োস্কোপে কুঁজো বুড়ির গল্প দেখে যাত্রাবাড়ী থেকে আসা শিশু জারা বলছিলেন, ‘অনেক মজার গল্প। শিয়াল আছে, বাঘ আছে, আর একটা দাদু আছে।’

জারা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। সে তার মা জুলেখা আক্তারের সঙ্গে মেলায় আসে। মেলা থেকে বেশ কিছু বইও কিনেছে সে। বিড়াল আর ইদুরের গল্প, ঝন্টুর ছোট মামা, বাবুই ও জোনাকি এবং কয়েকটি সায়েন্স ফিকশন কিনেছে জারা।

বইগুলো কত দিনে পড়বে, জানতে চাইলে জারার মা জুলেখা আক্তার বলেন, সর্বোচ্চ তিন দিন লাগতে পারে।

জুলেখা আক্তার বলেন, ‘জারা অনেক বই পড়ে। অন্য বাচ্চারা মোবাইল দেখতে চায়। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে আমি বইয়ের প্রতি বাচ্চার আগ্রহ বাড়িয়েছি। এ জন্য প্রতিবছর মেলায় এসে অনেকগুলো বই কিনে দিই। এর বাইরে সারা বছর পছন্দমতো বই কিনে দিই। মোবাইল দেখার চেয়ে বই পড়া ভালো।’

অমর একুশে বইমেলার তৃতীয় শিশুপ্রহরে বই দেখছে শিশুরা

১৬ শিশুকে নিয়ে মেলায় শিক্ষক

উত্তরার আকিজ ফাউন্ডেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১৬ জন অবহেলিত শিশুশিক্ষার্থীকে নিয়ে বইমেলায় আসেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক ইম্মত আরা ও কাণিজ হোসেন।

সহকারী শিক্ষক ইম্মত আরা জানান, স্কুলটিতে ৪৫০ জন শিক্ষার্থী আছে, যাদের বেশির ভাগই অসহায়, কিংবা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী পরিবারের নয়। এই শিশুদের বেশির ভাগের বাবা–মা তাদের খোঁজ রাখেন না। তাদের থেকে ১৬ জন শিশুকে নিয়ে মেলায় এসেছেন। স্কুল থেকে সবার জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের বাজেট আছে। এই বাজেটে শিশুরা পছন্দমতো বই কিনবে।

শিক্ষক কাণিজ হোসেন কয়েকজন শিশুকে কিনে দেন দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ‘ঠাকুমার ঝুলি’, বোরহান মাহমুদের ‘গল্পে গল্পে জ্ঞান’, নির্মলেন্দু গুণ ও আল মাহমুদের নির্বাচিত ছড়া। এ ছাড়া আরও বেশ কিছু বই তিনি উপহার দেন শিশুদের।

এই শিশুদের একজন মিম। সে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলে, ‘মেলা আসতে পেরে আমার অনেক ভালো লাগছে। আমি আবার আসতে চাই।’

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *