পশ্চিমবঙ্গে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের তোড়জোড় ভারতের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া মুসলিমদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাতেই কি এই নীল নকশা?
বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের পশ্চিমবঙ্গ অংশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ দ্রুত শেষ করতে নজিরবিহীন তৎপরতা শুরু করেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার ও কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। সম্প্রতি মালদহ জেলা প্রশাসন, বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) এবং সেন্ট্রাল পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট (সিপিডব্লিউডি)-এর মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল জেলার দুটি সীমান্ত ব্লক— হাবিবপুর এবং কালিয়াচক ৩-এর অন্তর্গত উন্মুক্ত সীমান্তে বেড়া দেওয়ার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা। গতকাল শুক্রবার (১৫ মে) টেলিগ্রাফ কলকাতার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, রাজ্য মন্ত্রিসভার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পর একটি সরকারি নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। নির্দেশিকা অনুযায়ী, বেড়া নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফ-এর হাতে তুলে দিতে হবে।
মালদহ জেলার প্রায় ১৭০ কিলোমিটার সীমান্ত বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত, যার সিংহভাগ অংশই এখনও বেড়াবিহীন। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, এই উন্মুক্ত সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ এবং জাল নোট ও নিষিদ্ধ সামগ্রী চোরাচালান বাড়ছে। গত পাঁচ মাসেই সেখানে ১৫ জনের বেশি অনুপ্রবেশকারী আটক হওয়ার অজুহাতে এই উদ্যোগকে ত্বরান্বিত করা হচ্ছে।
মালদহের জেলাশাসক রাজনবীর সিং কাপুর জানান, নির্ধারিত ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফ-এর কাছে জমি হস্তান্তর নিশ্চিত করতে বিএসএফ, সিপিডব্লিউডি এবং ভূমি সংস্কার দপ্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সমন্বয় ব্যবস্থা ও সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য ডেডিকেটেড হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ গড়ে তোলা হয়েছে। ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের অতিরিক্ত জেলাশাসক দেবহূতি ইন্দ্রের তথ্যমতে, সীমান্তের প্রায় ৩৩ কিলোমিটার অংশে বেড়া দেওয়ার জন্য ২৬০ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে।
দীর্ঘদিন ধরে এই বেড়া নির্মাণের বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল। তৎকালীন বিরোধী দল বিজেপি, জমি হস্তান্তরে বিলম্বের জন্য মমতা ব্যানার্জির পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকারের সমালোচনা করেছিল। তবে বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর শাসক দল হিসেবে বিজেপি জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে এই কাজকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
নেপথ্যের ভূরাজনীতি: পুশ-ইনের নীলনকশা?
ভারতের এই আকস্মিক তৎপরতাকে কেবল ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা’র চশমায় দেখতে নারাজ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও গবেষকরা। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গবেষক মেহেদী হাসান পলাশ এই উদ্যোগের পেছনে এক গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত নীলনকশা দেখছেন। এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “বিষয়টা আমরা পুরোপুরি বুঝতে পারছি না। এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আপনি বন্ধু বলবেন, আবার কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আমাকে ঘিরে রাখবেন— এরপর বন্ধুত্বের দাবি থাকতে পারে কি? বিশ্বের আর কোথাও বন্ধুত্বপূর্ণ দুটি দেশের সীমানায় কাঁটাতারের বেড়া আছে কি? তাদের মধ্যকার সম্পর্কের কেমিস্ট্রি কী, এই প্রশ্নের মীমাংসা করা জরুরি।” পশ্চিমবঙ্গের সাথে বাংলাদেশের মোট ২,২১৬ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে ১,৬৫৩ কিলোমিটার ইতিমধ্যেই কাঁটাতারে ঢাকা। বাকি থাকা ৫৬৩ কিলোমিটারের কাজ সম্পন্ন করতে নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই অতি-তৎপরতার পেছনে এক ভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন মেহেদী হাসান পলাশ। সূত্র: ইনকিলাব
