পদ্মা ব্যারাজ কী, এটি  কোথায় নির্মাণ করা হবে?  

বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা নদীর ওপর নতুন একটি ব্যারাজ নির্মাণ করতে যাচ্ছে সরকার। মেগা এই প্রকল্পটি আগামী সাত বছরে নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে। বুধবার ঢাকার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়।

‘পদ্মা ব্যারেজ’ নামের এই উন্নয়ন কর্মসূচির প্রাথমিক লক্ষ্য দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মৃতপ্রায় পাঁচটি নদী পুনর্জীবিত করা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নদীগুলোর আশপাশের ২৪টি জেলার পানিসংকট নিরসন হবে, যার ফলে প্রায় সাত কোটি মানুষ উপকৃত হবে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে ওই অঞ্চলে ব্যাপক খরা পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং পদ্মা নদীর সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য নদী শুকিয়ে যায়। এর ফলে নদী তীরবর্তী এলাকায় লবণাক্ততা দেখা দেয়। অন্যদিকে, বর্ষা মৌসুমে কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতাও তৈরি হয় বলে জানান মন্ত্রী।

“সবদিক বিবেচনায় এই প্রকল্পটিকে আমরা বলছি যে মাস্টারমাইন্ড প্রকল্প, যেটা আমাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল, ইশতেহারে ছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান নির্বাচনের পূর্বে রাজশাহীতে গিয়ে জনসাধারণের সামনে সেটা বক্তব্য রেখেছিলেন, কমিটমেন্ট (অঙ্গীকার) করেছিলেন। সেটা বাস্তবায়নের জন্য এই প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত হয়েছে,” বুধবার একনেক সভা শেষে সাংবাদিকদের বলেন মি. এ্যানি।

আগামী অর্থবছরেই প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ২০৩৩ সালের মধ্যে ব্যারাজ নির্মাণ শেষে ওই অঞ্চলে তিনটি পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সাতটি স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী। কিন্তু ব্যারাজ জিনিসটা আসলে কী? এটি কখন এবং কেন নির্মাণ করা হয়?

ব্যারাজ হলো পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে নদী বা জলাধারের ওপর আড়াআড়িভাবে নির্মিত বিশেষ একটি অবকাঠামো। ড্যাম বা বাঁধের সঙ্গে এর বড় পার্থক্যের জায়গা হলো বাঁধের মাধ্যমে সাধারনথ জলাধারের পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গাজুড়ে পানি ধরে রাখা হয়। অন্যদিকে, ব্যারেজের মাধ্যমে পানির প্রবাহ বন্ধ করার পরিবর্তে সেটির গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এক্ষেত্রে মূল অবকাঠামোতে একাধিক দরজা রাখা হয়, যেখান দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়।

সাধারণত ব্যারেজ নির্মাণের আগে সেটার উজানে এক বা একাধিক কৃত্রিম খাল খনন করা হয়। এরপর পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে ওইসব খালে পানি ঢোকানো হয়। সেই পানি পাম্পের মাধ্যমে কৃষি জমিতে সেচ আকারে দেওয়া হয়। আবার অনেক সময় ব্যারাজের মাধ্যমে এক নদীর পানি অন্য নদীতে নিয়ে সেটির প্রবাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে সেটিই করার পরিকল্পনা করছেন কর্মকর্তারা। “যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে যেখানে ব্যারাজ প্রয়োজন, সেখানে যদি এটি নির্মাণ করা যায় এবং ঠিকঠাকমত কাজে লাগানো যায়, তাহলে অনেক ধরনের সুবিধা পাওয়া সম্ভব,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আনিসুল হক। আবার এর ব্যত্যয় ঘটলে হিতে বিপরীতও হতে পারে বলে জানাচ্ছেন এই বিশেষজ্ঞ। “তখন দেখা যাবে ব্যারাজ কোনো কাজে লাগছে না, বরং শুধু শুধু অর্থের অপচর হয়েছে এবং নদীও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কাজেই ব্যারাজ নির্মাণের আগে ভালোমত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নির্মাণের পর সেটির ঠিকঠাক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি,” বলেন করেন অধ্যাপক হক।বাংলাদেশে আগেও বিভিন্ন সময় নদীর ওপর ব্যারাজ নির্মাণ করতে দেখা গেছে। এর মধ্যে ১৯৮৩ সালে মৌলভীবাজারে মনু নদীর ওপর প্রথমবার একটি ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়েছিল, যেটি মনু ব্যারাজ নামে পরিচিত। পরে ১৯৯০ সালে লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর ওপর তিস্তা ব্যারেজ এবং ঠাকুরগাঁওয়ের টাঙ্গন নদীর ওপর টাঙ্গন ব্যারেজ তৈরি করা হয়।

পদ্মায় ব্যারাজ কেন?

২০২৬ সালে এসে সরকার পদ্মা নদীর ওপর ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন পেলেও বিষয়টি নিয়ে আগেও বিভিন্ন সরকারের সময় আলোচনা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত অন্তত চার দশকে ব্যারাজের সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণে চারটি সমীক্ষা পরিচালিত হয়েছিল। এমনকি, বিএনপি সরকারের গত মেয়াদে ২০০৫ সালে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়। সূত্র: ইনকিলাব

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট