সম্পাদকীয়

তারেক রহমানের দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত

বহুল আলোচিত ও প্রতিক্ষিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প ১৩ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে। দেশ ও দেশের মানুষের জন্য দিনটি অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের আলোচনা ও দাবি সামনে আসে ষাটের দশকে। তারপর থেকে প্রকল্পটির সমীক্ষা হয়েছে কয়েক বার। ২০০৫ সালে বিএনপি সরকারের আমলে এর ব্যাপক ভিত্তিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়, শেষ হয় ২০১৩ সালে। কিন্তু আজ পর্যন্ত প্রকল্পটির অনুমোদন ও বাস্তবায়নে কোনো সরকারই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। গত অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েও শেষ পর্যন্ত বিরত থাকে। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে ভারতের আপত্তির কথা অনেকেরই জানা। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ভারতের বিরাগভাজন হওয়ার আশংকায় ভারতবান্ধব স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারও এই প্রকল্প বাস্তবায়ন থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে। অন্তর্বর্তী সরকারেরও উদ্যোগ থেকে সরে আসার কারণ থাকতে পারে। সময়সল্পতা একটি কারণ হতে পারে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে রাজশাহীতে এক জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। সরকার গঠনের পর তিনি এই প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে যাননি। গত ৬ মে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় তারেক রহমান পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা করেন এবং সেই আলোচনাতেই সিদ্ধান্ত হয় অর্থনৈতিক পরিষদের আগামী সভায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পটির উপস্থাপন করা হবে। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পটি ব্যাপক ব্যয় সাপেক্ষ, বিশাল ও বহুমুখী একটি প্রকল্প, যার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে। প্রকল্পটির ব্যাপারে যেহেতু ভারতের ঘোর আপত্তি, তাই সে চাইবে প্রকল্প যাতে বাস্তবায়ন না হয়। সম্ভাব্য সকল উপায়ে সে এর বিরোধিতা করবে এবং বাধাদানের চেষ্টা করবে, সেটা সহজেই অনুমেয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত, সন্দেহ নেই। প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন জাতীয় ও জনস্বার্থের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের এক তৃতীয়াংশ মানুষ এতে সরাসরি উপকৃত হবে। এর সঙ্গে কৃষি ও শিল্পের, উৎপাদন, মিঠা পানির সংস্থান, মৎস্য উৎপাদন, প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ ইত্যাদির ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রধান প্রতিপাদ্য ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। যেমন তার পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ছিল, ‘জীবন বাংলাদেশ, আমার মরণ বাংলাদেশ’ এবং তার মাতা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছিল, ‘বাংলাদেশ ছাড়া আমার আর কোন ঠিকানা নেই’। বস্তুত বাংলাদেশের জন্য, বাংলাদেশের স্বার্থে এবং বাংলাদেশের কল্যাণেই তারেক রহমানের এই দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত। আমরা তাকে মোবারকবাদ জানাই, ধন্যবাদ জানাই। পানি সমস্যা অনেকদিন ধরে বাংলাদেশের জীবন-মরণ সমস্যা হিসাবে বিরাজমান রয়েছে। উজান থেকে ভারতের এক তরফা পানি প্রত্যাহারই এর প্রধান কারণ। ৫৪টি অভিন্ন নদীর উভয় দেশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত। এসব নদীতে ভারত বাঁধ, গ্রোয়েন, পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প ইত্যাদি নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। এর মধ্যে পদ্মার উজানে গঙ্গায় ফারাক্কা ব্যারাজ এবং তিস্তার উজানে গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণ করে বেপরোয়া পানি ছিনতাই করে নিচ্ছে। ফলে এই দুই নদীর বাংলাদেশ অংশ পানি শূন্যতার ভয়াবহ শিকার হচ্ছে। নদনদী মরে যাচ্ছে। ভূগর্ভের পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। কৃষি ও শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। মিঠাপানির সংকট ইতোমধ্যে মারাত্মক রূপ নিয়েছে। সভ্যতার সংরক্ষণ ও বিকাশে মিঠা পানির প্রয়োজনীয়তা সর্বাধিক। জ্বালানি তেল এখন সবচেয় দামী বলে পরিগণিত হয়ে থাকে। অথচ, তেলের চেয়েও দামী মিঠা পানি। ইরানযুদ্ধে তেল পরিবহন বন্ধে হরমুজে অবরোধ হয়েছে। জাহাজে হামলা হয়েছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের মিঠাপানির উৎসে কোথাও হামলা হয়নি। বাংলাদেশে পানি নিয়ে সংকট একমুখী না; দ্বিমুখী। শুকনার সময়ে পানির সংকট-অভাব আর বর্ষার সময়ে ভয়ংকর বন্যা, যার বড় কারণ ভারতের ঠেলে দেয়া ঢল। এতে পদ্মা ও তিস্তার বাংলাদেশ অংশে বন্যা ও নদীভাঙন প্রতিবছরের সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ফসল ও সম্পদহানি এবং দারিদ্র্যের বিস্তার ক্রমাগতই বাড়ছে। এমতাবস্থায়, দেশ বাঁচাতে, মানুষ বাঁচাতে পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। পদ্মা ব্যারাজের মতো তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়েও ভারতের আপত্তির শেষ নেই। অথচ তিস্তার পানি বণ্টনচুক্তি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও ভারত তা বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রেখেছে। তিস্তার পানি চুক্তি আদৌ হবে, তেমন কোনো আলামত নেই। এই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের চীন সফরের সময় এ বিষয়ে চীনের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। চীনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। চীনও সহযোগিতা দিতে সম্মত হয়েছে। খুব শিগগিরই প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা আশা করি, সেই সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত হবে। আমরা এও আশা করি, পদ্মা ব্যারাজে চীনের সহযোগিতা নিয়ে চীনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও তার আলাপ হবে। এই দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ সংগতকারণেই অত্যন্ত জরুরি ও অত্যাবশ্যক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্তের লক্ষ্য যেহেতু দেশ ও জনগণের সার্বিক উন্নয়ন, সুরক্ষা ও বিকাশ, সুতরাং দেশের দলমত নির্বিশেষে সকলের একান্ত কর্তব্য হবে তাকে সমর্থন করা ও তার পাশে দাঁড়ানো। বলা বাহুল্য, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, কথাটি সকলের মনে রাখতে হবে।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট