সন্তান জন্ম দিয়ে চিরঘুমে মা

ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি ছিল ‘বিশ্ব মা দিবস’। যখন চারদিকে মায়েদের প্রতি ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার জোয়ার, ঠিক তখনই বরিশালের আগৈলঝাড়ার ফুল্লশ্রী গ্রামে নেমে এলো এক বিষাদময় অন্ধকার। মা দিবসের বিকেলেই পৃথিবীর আলো দেখা নবজাতকের কোলজুড়ে দিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন মা জয়ন্তী হালদার (৩৫)। এক বোনকে স্বাগত জানাতে গিয়ে অন্য বোন হারাল তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়— নিজের মাকে। জয়ন্তী হালদার ফুল্লশ্রী গ্রামের রূপম দাসের স্ত্রী। তিনি আগৈলঝাড়া উপজেলায় পরিবার কল্যাণ সহকারী পদে কর্মরত ছিলেন। মাঠকর্মী হিসেবে গ্রামবাসীকে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছিলেন জয়ন্তি হালদার।

তার ৯ বছর বয়সী মেয়ে রুপন্তি দাস আগৈলঝাড়া সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী। শনিবার (০৯ মে) রাতে স্বামী রূপম দাস ছিলেন কর্মস্থলে। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা জয়ন্তী হালদার নিজের ঘরেই ছিলেন। হঠাৎ গোঙানির শব্দে শাশুড়ি দেবযানী দাস ঘরে ছুটে গিয়ে দেখেন পুত্রবধূ অচেতন। আনন্দ আর আশঙ্কার দোলাচলে থাকা পরিবারটি জয়ন্তীকে নিয়ে ছোটেন আগৈলঝাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে নেওয়া হয় বরিশাল শেরে-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চিকিৎসকরা জানান, জয়ন্তী একলাম্পশিয়ায় আক্রান্ত।

এদিকে, দীর্ঘ ১৭ ঘণ্টা জয়ন্তীর কোনো জ্ঞান ছিল না। নিথর দেহটা হাসপাতালের বিছানায় পড়ে থাকলেও গর্ভের সন্তানটি যেন লড়ছিল বাঁচার জন্য। চিকিৎসকদের পরামর্শে রোববার দুপুর ২টায় যখন বিশ্বজুড়ে মা দিবস উদযাপিত হচ্ছে ঠিক তখন অপারেশন থিয়েটারে সিজারের মাধ্যমে জন্ম নেয় এক ফুটফুটে কন্যাসন্তান। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে, সন্তানের কান্নার শব্দ যখন আনন্দ পৌঁছে দেওয়ার কথা, তখনই জয়ন্তীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। সিসিইউ ও আইসিইউতে যমে-মানুষে টানাটানির পর বিকেল ৫টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মমতাময়ী মা।

রোববার রাতে যখন অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাজিয়ে জয়ন্তীর নিথর দেহ ফুল্লশ্রী গ্রামে পৌঁছাল, পুরো এলাকার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে স্বজনদের আহাজারিতে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি কাঁদিয়েছে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী রূপন্তি দাসের সেই পাথর হয়ে যাওয়া চাহনি। হাজারো মানুষের ভিড়ে ৯ বছরের শিশুটি নির্বাক দৃষ্টিতে খুঁজছিল তার মাকে। সে কি জানে, আজ মা দিবস? সে কি বুঝতে পারছে, এখন থেকে প্রতি বছর যখন মানুষ ফেসবুকে বা কার্ডে মাকে শুভেচ্ছা জানাবে, তখন তাকে তার মায়ের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে অশ্রু মুছতে হবে?

পেশায় পরিবার কল্যাণ সহকারী জয়ন্তী হালদার অন্যের ঘরে সুসংবাদ পৌঁছে দিলেও নিজের ঘরটি আজ অপূর্ণ করে দিলেন। তার সাত মাসের নবজাতক কন্যাটি এখন শেবাচিম হাসপাতালে ইনকিউবেটরে চিকিৎসাধীন রয়েছে। মা নেই, মায়ের বুকের ওম নেই, আছে শুধু একরাশ শূন্যতা। বছর ঘুরে যখনই মা দিবস ফিরে আসবে, বড় বোন রূপন্তি আর সদ্যোজাত ছোট বোনটি হয়তো একে অন্যের দিকে তাকিয়ে খুঁজে ফিরবে সেই হারানো ছায়া। ফুল্লশ্রী গ্রামের মানুষের মনে আজ একটাই দীর্ঘশ্বাস- এমন মা দিবস যেন আর কারও জীবনে না আসে। সূত্র: কাল বেলা

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট