হাম অপ্রতিরোধ্য কেন?
হাম অপ্রতিরোধ্য। সারাদেশে মহামারির আকার ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ শিশুর ইতোমধ্যে হামের টিকা দেয়া হয়েছে। একথা সত্য হলে হামে শিশু মৃত্যুর হার কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু কমার বদলে মৃত্যুর হার ক্রমবর্ধমান। প্রতিদিনই সারাদেশে ৮-১০ জন শিশু মারা যাচ্ছে। হেলথ সার্ভিস ডাইরেক্টেরটের হিসাব অনুযায়ী গত শনিবার পর্যন্ত সারাদেশে হামে মৃত্যুবরণ করেছে ৩৫২ শিশু। আক্রান্ত হয়েছে ৫৪ হাজার ৬৩৫ জন। মৃত্যু ও আক্রান্তের এই হিসাবের অনেক বেশি শিশু মৃত্যুবরণ ও আক্রান্ত হয়েছে বলে ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা। আমাদের দেশে পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন রয়েছে। এক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হয়েছে, সেটা বলার সময় এখনো আসেনি। এ কথা অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় হাম প্রতিরোধে সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল ও প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহীত বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টির পরিচয় দিতে সফল হননি। হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যুর তথ্য পাওয়ার পরপরই জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলে হাম এভাবে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারতো না। চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রথম হামে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মেলে কক্সবাজারে। এর সঠিক তথ্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যথাসময়ে জানতে পারেনি। সে কারণে এই রোগ প্রতিরোধে ও চিকিৎসায় ব্যবস্থা নিতে পারেনি। রাজশাহীতে হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হলে এই রোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে মানুষ অবহিত হতে পারে। তারপর সারাদেশেই হাম ছড়িয়ে পড়ে, যা এখনো মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে। সরকারের পক্ষ থেকে বা সরকারের পক্ষ নিয়ে কেউ কেউ বলতে চাইছেন, বিগত স্বৈরাচারী সরকার ও তৎপরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার হামের টিকা আনতে অবহেলা প্রদর্শন করায় এ রোগ এতটা ভয়াবহ রূপে ছড়িয়ে পড়তে পেরেছে। নিঃসন্দেহে এটা ওই দুই সরকারের চরম ব্যর্থতা। তবে অনেকেই অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজের দায়িত্বশীলতা লঘু করতে অভ্যস্থ। এক্ষেত্রেও এটা দেখা যাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। অতীত টেনে যারা দায়িত্বশীল তাদরে পার পাওয়ার উপায় নেই। তাদের উচিত, হাম প্রতিরোধে সর্বোচ্চ উদ্যোগ ও পদক্ষেপ নেয়া। আমাদের দেশে রোগব্যাধির যেমন অন্ত নেই তেমনি চিকিৎসা ব্যয়েরও কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। সরকারি হাসপাতাল আছে বটে, যেখানে চিকিৎসার খরচ তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু সরকারি হাসপাতালস্বল্পতার কারণে সেখানে সবার চিকিৎসা নেয়া সম্ভব হয় না। বাধ্য হয়ে তাদের বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতালের শরনাপন্ন হতে হয়। বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় অত্যাধিক। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ বহন করতে হয় রোগীর পরিবারকে। যে কোনো রোগের চিকিৎসাই ব্যয়বহুল, গুরুতর রোগে স্বভাবতই আরো ব্যয়বহুল। কোনো সাধারণ বা স্বল্প আয়ের মানুষের পক্ষে চিকিৎসাব্যয় বহন করা দুঃসাধ্যই নয়, অসাধ্যও বটে। চিকিৎসাব্যয় বহন করতে গিয়ে জমি-সম্পদ বিক্রী করা এক সাধারণ বাস্তবতা। পর্যবেক্ষকদের মতে, চিকিৎসাব্যয় বহন করতে গিয়ে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে দারিদ্র্যও। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিনী বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. জোবাইদা রহমান সম্প্রতি রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে এক মতবিনিময় সভায় দরিদ্র বৃদ্ধির কথাটি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সরকারের বাধ্যবাধকতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, আমাদের স্বাস্থ্যখাত ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, প্রভৃতি পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায়ও পিছিয়ে আছে। তিনি স্বাস্থ্যসেবা যথাযথ ও নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন। তার এ তাগিদ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সবাই আশা করে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এই তাগিদের গভীরতা অনুভব করে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও কার্যব্যবস্থা গ্রহণ করবে। মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্যের দিক দিয়ে যে জাতি যতটা সমৃদ্ধ, সে জাতি ততটা উন্নত। জাতীয় সার্বিক উন্নয়নের প্রত্যাশা পূরণ করতে চাইলে অবশ্যই আমাদের জাতিকে স্বাস্থ্যবান জাতিতে পরিণত করতে হবে। কাজটি অত্যন্ত কঠিন। বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে, ফটোসেশন করে এটা হবে না। এর জন্য নিরলস ও নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে হবে। কথার চেয়ে কাজকেই গুরুত্ব ও প্রাধান্য দিতে হবে। এর বিকল্প নেই।
