সম্পাদকীয়

শিক্ষা খাতকে জামায়াতমুক্ত করতে হবে

শিক্ষা খাতকে জামায়াতমুক্ত করতে হবে

গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জামায়াতে ইসলামী সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড, মাদরাসা বোর্ড, ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশাসনসহ সর্বত্র নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করে। অন্তর্বর্তী সরকারে থাকা কোনো কোনো উপদেষ্টার সহযোগিতায় জামায়াতের পদধারী, সমর্থক ও অনুসারিরা গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখল করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় ৩২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দলটির মতাদর্শের ভিসি নিয়োগ দেয়া হয়। দলটি পুরো শিক্ষাখাতকে নিজের দখলে নিয়ে নেয়। প্রশাসনে আধিপত্য বিস্তার করে ছায়া সরকারে পরিণত হয়। বলা হয়ে থাকে, স্বাধীনতার পর থেকে দলটি এমন ক্ষমতা উপভোগের সুযোগ আর কখনো পায়নি। জামায়াত সবার আগে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে টার্গেট করে। এর ফলাফল দেশবাসী দেখেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ যে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে, তাতে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিসহ প্রশাসন ছাত্রশিবিরের অনুকূলে থাকায় এসব নির্বাচনে তার বিজয় নিশ্চিত হয়। পরবর্তীতে ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রশিবির নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে কীভাবে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেছে, তা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর গত আড়াই মাসে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান জামায়াতমুক্ত হলেও মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড, মাদরাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটসহ বেশিরভাগ মাদরাসাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এখনো জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে থাকা দুঃখজনক। শিক্ষামন্ত্রী দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং কর্মঠ। তবে তার মাইন্ডসেট যেন সেই ‘নকল ধরার’ মধ্যে আবদ্ধ হয়ে রয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তিনি বেশ সমালোচিত হয়েছেন। অনেকের মতে, বাস্তবতার সাথে তিনি নিজেকে এখনো খাপ খাইয়ে নিতে পারেননি। আধুনিক প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মাইন্ডসেট এবং লেখাপড়ার ধরনে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তাদের মধ্যে নকল করার প্রবণতা কম। তাদের যে সমস্যা তা হচ্ছে, তারা সুসম, যথাযথ ও যুগোপোযোগী শিক্ষাসংকটে ভুগছে। গতকাল বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত ইউনিসেফের এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বেশির ভাগ প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা বেসিক দক্ষতা ছাড়াই মাধ্যমিকে প্রবেশ করছে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে যে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করেছে, তাদের ৯১ ভাগই পঞ্চম শ্রেণির অংক ও ৬৫ ভাগ বাংলা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। এ থেকে সহজেই বোঝা যাচ্ছে, শিক্ষার মান কোথায় অবস্থান করছে। এ ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রীর সচেতন হওয়া এবং দৃষ্টি দেয়া জরুরি। তাকে মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে শিক্ষার্থীদের যথাযথ শিক্ষা লাভের ওপর জোর দিতে হবে। এ ব্যাপারে তাকে দক্ষতা ও বিজ্ঞতার পরিচয় দিতে হবে। বলা হয়ে থাকে, তার মন্ত্রণালয় লোকজনের পদচারণায় ভারি হয়ে উঠেছে। কাজ যতটা হওয়া প্রয়োজন, তা হচ্ছে না। এমন হলে কীভাবে হবে? একদিকে শিক্ষা খাতে জামায়াতের আধিপত্য, অন্যদিকে পাঠ্যক্রমের ত্রুটি, এই দুইয়ে মিলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বিশৃঙ্খলার মধ্যে রয়েছে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, জামায়াতে ইসলামী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নানাভাবে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি এবং নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করেছে। নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর বিভিন্ন ইস্যুতে নতুন করে সংকট তৈরি অব্যাহত রেখেছে। রাজনীতির মাঠে তার ব্যাপকভাবে সক্রিয় হওয়ার আলামত প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। স্থানীয় নির্বাচন তার লক্ষ্য। এ নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করার জন্য নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। অন্যদিকে, বিএনপি নিস্ক্রিয় হয়ে রয়েছে। ফলে পর্যবেক্ষকরা আগামী স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপির বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন। এক্ষেত্রে জামায়াতের দখলে থাকা শিক্ষাখাত বড় ধরনের ফ্যাক্টর হয়ে উঠবে। বিএনপি যে এ খাতে এখনো সক্রিয় বা যথাযথ দৃষ্টি দিচ্ছে না, তা জামায়াতের আধিপত্য থেকে বোঝা যাচ্ছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, শিক্ষা খাতকে জামায়াতমুক্ত করে দেশের মানুষের আকাক্সক্ষা অনুযায়ী, এ খাতে বিএনপির নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা উচিত। ভ্রান্ত মওদুদী মতবাদ থেকে দেশের মানুষকে মুক্ত রাখতে শিক্ষা খাতকে জামায়াতমুক্ত করতে হবে। শুধু শিক্ষা খাতই নয়, প্রশাসনের যেখানেই ঘাপটি মেরে থাকা জামায়াতের লোকজন রয়েছে, সেখানেই সরকারের তীক্ষè নজর রাখতে হবে। তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, অথবা অপসারণ করতে হবে।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট