মুখোশ উন্মোচন করলেন গবেষক প্রতীতি দেব পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদী নারীবাদের আড়ালে যেভাবে মুসলিম বিদ্বেষ ছড়িয়েছে বিজেপি

২০২৪ সালের সেই কালিমালিপ্ত আরজি কর কাণ্ড থেকে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন—পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নারী নিরাপত্তাকে এক ভয়ংকর ও সুদূরপ্রসারী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে হিন্দুত্ববাদী শক্তি। সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে গবেষক প্রতীতি দেব দেখিয়েছেন, কীভাবে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদকে পুঁজি করে বাংলায় ‘ফেমো-ন্যাশনালিজম’ বা নারী-জাতীয়তাবাদের বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। যেখানে নারী অধিকারের আড়ালে মূলত মুসলিম পুরুষদের লক্ষ্যবস্তু করা এবং সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। আরজি করের ন্যায়বিচারের দাবিকে পাশ কাটিয়ে কীভাবে সুকৌশলে ‘শত্রু নারীবাদ’-কে কাজে লাগিয়ে হিন্দুত্ববাদী শক্তি বাংলার ক্ষমতার মসনদ দখল করল, তারই এক চাঞ্চল্যকর ও তাত্ত্বিক চিত্র উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে।

মূল প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ:

আরজি করের অপব্যবহার: সাধারণ মানুষের আবেগকে ব্যবহার করে আন্দোলনকে ইসলামবিদ্বেষী রূপ দান। ফেমো-ন্যাশনালিজম: নারী নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে মুসলিম পুরুষদের দানবীয় হিসেবে উপস্থাপন করার পশ্চিমা কৌশল এখন পশ্চিমবঙ্গে। ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট: ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘বাংলাদেশি’ জুজু দেখিয়ে ভোটের মাঠে ফায়দা লুটেছে বিজেপি।

২০২৪ সালের আগস্ট মাসে কলকাতার আরজি কর সরকারি হাসপাতালে আমারই বয়সী এক নারী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পর শহরের রাজপথে মানুষের ঢল নেমেছিল। বস্তি থেকে শুরু করে অভিজাত আবাসন—সর্বস্তরের মহিলারা মোমবাতি হাতে মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। একটি প্রাতিষ্ঠানিক মদতপুষ্ট এই নৃশংস অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল অনিবার্য। কিন্তু সেই হাজার হাজার মানুষের মিছিলে যখন আমার উচ্চবর্ণের মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরাও সামিল হচ্ছিলেন (যাঁরা আগে কখনও রাজপথে নামেননি), তখন মনে কিছু প্রশ্ন জেগেছিল: এই বিশেষ মুহূর্তেই কেন এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ? কিসের বিরুদ্ধে এই লড়াই? কারা লড়ছেন? পশ্চিমবঙ্গকে প্রায়ই ‘দলীয় সমাজ’ বলা হয়, যেখানে রাজনৈতিক প্রভাব মানুষের দৈনন্দিন জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকে। আরজি কর আন্দোলন ছিল সরাসরি শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) বিরুদ্ধে। সিপিআই(এম) এই ঘটনাকে সংবাদমাধ্যমের সামনে আনতে অগ্রণী ভূমিকা নেয়। অন্যদিকে, একদল শিক্ষার্থী ও নারী অধিকার কর্মী এই আন্দোলনকে ‘অরাজনৈতিক’ রাখার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি, হিন্দুত্ববাদী শক্তি বিজেপি-ও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে নিজস্ব প্রতিবাদ কর্মসূচি গড়ে তোলে।

২০২৪-এর ১৪ই আগস্ট রাতে যাদবপুর ৮বি বাসস্ট্যান্ডে যখন আমি ‘রাত দখল’ আন্দোলনে সামিল হয়েছিলাম, তখন মনে এক অদ্ভুত দ্বিধা কাজ করছিল। একজন নারীবাদী হিসেবে আমি সেখানে উপস্থিত থাকলেও, আন্দোলনের ধরণে আমি বিচলিত বোধ করছিলাম। আমার মা—যিনি নিজেও একজন আজীবন নারীবাদী—এবং আমি আলোচনা করছিলাম কেন এই আন্দোলনে হিন্দু দেবীদের ছবি ব্যবহার করা হচ্ছে? আমাদের নারীবাদ তো শিখিয়েছিল: ‘দেবী নয়, মানুষ হিসেবে সমানাধিকার চাই।’ সেখানে কেন বিজেপির কর্মীদের ভিড়? কেন সেই মুসলিম নারী কর্মীদের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না, যাঁরা সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিলেন? কেন মহিলাদের জন্য নির্ধারিত জায়গাতেই পুরুষরা মহিলাদের ধাক্কা দিচ্ছে? এটা কি সত্যিই নারীবাদী আন্দোলন?

২০২৫ সালে সোফি লুইসের বই ‘ঊহবসু ঋবসরহরংসং’ পড়ার পর আমার ধারণা স্পষ্ট হয়। লুইস যুক্তি দিয়েছেন যে, পশ্চিমী নারীবাদের উৎস ও বর্তমান রূপটি ফ্যাসিবাদ এবং শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সব নারীবাদই ভালো নয়; কিছু নারীবাদ আসলে অন্য নারীবাদের শত্রু। একে তিনি ‘শত্রু নারীবাদ’ বা ‘এনিমি ফেমিনিজম’ বলে অভিহিত করেছেন। ভারতে এই শত্রু নারীবাদই হলো ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদী নারীবাদ’, যাকে সমাজবিজ্ঞানী সারা ফ্যারিস ‘ফেমো-ন্যাশনালিজম’ বলে চিহ্নিত করেছেন। এর অর্থ হলো—নারী নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে মুসলিম পুরুষদের দানবীয় হিসেবে তুলে ধরা এবং মুসলিম মহিলাদের কলঙ্কিত করা। ভারতে ‘লাভ জিহাদ’-এর নামে মুসলিম পুরুষদের হেনস্থা করা বা বিলকিস বানোর ধর্ষকদের মালা পরিয়ে বরণ করে নেওয়া এই রাজনীতিরই অংশ। সূত্র: ইনকিলাব

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট