তৃণমূলকে চাঙা করতে বড় পদক্ষেপ নিচ্ছে বিএনপি
টানা দেড় যুগ বিরোধী রাজনীতির পর ক্ষমতায় আসীন বিএনপি। সরকার গঠনের পর হঠাৎই দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে ধীরগতি। দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ডেও ঘাটতি স্পষ্ট। সে সব কাটিয়ে তৃণমূলকে চাঙা করতে দ্রুত পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় যেতে চাইছে দলটি। দল ও সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় সাংগঠনিক শৃঙ্খলা জোরদার এবং চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠায় বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলটি। স্থানীয় পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সমন্বয়হীনতা এবং কিছু নেতাকর্মীর উচ্ছৃঙ্খল আচরণে সরকার ও দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থেকে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব এখন সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনে জোর দিচ্ছে। দলীয় একাধিক সূত্রে এমনটিই জানা গেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ৯ মে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশে অনুষ্ঠেয় এ বৈঠকে সারাদেশের জেলা পর্যায়ের বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক পর্যায়ের নেতারা অংশ নেবেন। এমনটি জানিয়েছেন বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বগ্রহণের পর তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে এটিই হতে যাচ্ছে তারেক রহমানের প্রথম বড় কোনো সাংগঠনিক বৈঠক। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, বৈঠকে দলীয় শৃঙ্খলা, সাংগঠনিক কার্যক্রম, স্থানীয় পর্যায়ের বিরোধ এবং চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরাসরি নির্দেশনা দিতে পারেন তিনি। দলের একাধিক সূত্র বলছে, ওই বৈঠকে ৮২টি সাংগঠনিক জেলার সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবদের অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে তৃণমূল নেতাদের কাছ থেকে দল, সরকার, স্থানীয় সমস্যা, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল সম্পর্কেও মতামত নেওয়া হতে পারে।
জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা সব জেলা ইউনিটের নেতাকে নিয়ে একটি বৈঠক করার পরিকল্পনা করছি। সেখানে আমাদের নেতা তারেক রহমান সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার এবং দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন।’ দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দুজন নেতার সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, দলের পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে তারা শিগগির তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। তাদের ভাষ্য, বড় সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কেন্দ্র ও তৃণমূল—দুই পর্যায়ের মতামত নিতে আগ্রহী দলীয় প্রধান। দলটির নেতারা মনে করছেন, নির্বাচনের পর অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। এতে সাংগঠনিক কার্যক্রমে এক ধরনের শূন্যতা বা শৈথিল্য তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও তৃণমূল ইউনিটগুলোর মধ্যে সমন্বয়ও দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে প্রভাবশালী নেতাদের সরকার ও সংসদীয় কাজে ব্যস্ততার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে ধীরগতিতে। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়া, সমন্বয়ের অভাব, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং দুর্বল তদারকিকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য, যিনি বর্তমানে মন্ত্রীর দায়িত্বেও রয়েছেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতার অগ্রহণযোগ্য কর্মকাণ্ড মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জনগণের চোখে সরকার ও দলকে আলাদা করা যায় না। দলীয় কর্মীরা খারাপ আচরণ করলে মানুষ সরকারকেও দায়ী করবে। এটি সরকার ও দল-উভয়ের জন্যই সতর্কবার্তা।’ ‘সরকার ভালো করার চেষ্টা করছে। কিন্তু দলের কিছু নেতাকর্মী এমন কাজ করছেন, যা দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে’ যোগ করেন তিনি। দলীয় সূত্রে জানা যায়, সরকার ও দলের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে এখন সরকারের বাইরে থাকা জ্যেষ্ঠ নেতাদের আরও সক্রিয় করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। যেসব নেতা মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য হননি, তাদের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পুনর্গঠন তদারকি এবং দলীয় কার্যক্রম আরও গতিশীল করার দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে বছরের শেষ নাগাদ জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতিও শুরু করেছে বিএনপি। কাউন্সিলের আগে তৃণমূল ইউনিটগুলো পুনর্গঠন, অভ্যন্তরীণ বিভাজন কমানো এবং বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটি হালনাগাদের পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। বিএনপি সর্বশেষ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল করেছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। দলীয় গঠণতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও গত ১৭ বছরের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বাস্তবতায় তা সম্ভব হয়নি বলে দাবি দলটির নেতাদের।
তথ্য বলছে, বিএনপির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে ১০টির কমিটির মেয়াদ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, যুবদল, কৃষক দল, মহিলা দল, শ্রমিক দল, জাসাস ও মৎস্যজীবী দল। ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে চলতি বছরের ১ মার্চ। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ঘোষিত যুবদলের আংশিক কমিটিও এখনো পূর্ণাঙ্গ হয়নি। স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছর। কৃষক দলের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় দেড় বছর আগে। অন্যদিকে মহিলা দল, শ্রমিক দল ও মুক্তিযোদ্ধা দলের একাধিক কমিটি এক দশকের বেশি সময় ধরে বহাল। মৎস্যজীবী দলের কমিটি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিলুপ্ত করা হলেও নতুন কমিটি ঘোষণা এখনো হয়নি। সূত্র: জাগো নিউজ
