ইসলামের আলোকে শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার
মোহাম্মাদ মাকছুদ উল্লাহ
শ্রমিককে যদি মানব সভ্যতার নির্মাতা বলা হয়, তাহলে অত্যুক্তি হবে হবে হয়তো! কিন্তু যে আলিশান প্রাসাদে বসে সভ্যসমাজের অধিপতিগণ সভ্যতার চুড়ান্ত সুফল ভোগ করেন আর তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন সেটা যে ঐ শ্রমিকের ঘামে ভেজা, যে দস্তাবেজে সভ্যতার দলীল সংরক্তিত সেটাও শ্রমিকের শ্রমেরই ফসল, যে উপাদেয় আহার্য সমাজের এলিটদের জীবন ও লালসা পূরণ করে তাও শ্রমিক তার রক্ত পানি করে উৎপাদন করে। এক কথায় বলতে গেলে সমাজ ও সভ্যতার যা কিছু সভ্যতার দলিল, তার সবই শ্রমিকের রক্ত দিয়ে লেখা। কিন্তু সেই শ্রমিক চিরকাল বঞ্চিত সকল দেশে, সব সমাজে। শুধু পহেলা মে, আসলে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে শ্রমিকের অধিকারের কথা বলা হয়, রাজপথে মিছিল হয়, নানা রঙ্গের ফেস্টুন আর ব্যানারে সজ্জিত র্যালি বের হয়, আয়োজন করা হয় সেমিনার-সেম্ফুজিয়াম। মঞ্চে আসন পান শ্রমিকের অধিার হরনকারী কিছু বুর্জুয়া আর আইন প্রনেতা। তারা তাদের বক্তৃতায় জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেন, শোনান অনেক আশার বাণী। কিন্তু শ্রমিকের অবস্থান যে তীমিরে ছিলো সেখানেই থেকে যায়। র্যালিতে অংশ গ্রহনের মজুরী হিসেবে একটা ক্যাপ, একটা গেঞ্জি ওদের প্রাপ্য ফি বছর। ওদের ভাগ্য বদলায় না। কারণ যাদের ভাতে ভাগ্য বদলের চাবিকাঠি যাদের হাতে, তারা প্রতারক। তারা চায় বক্তৃতার ফুলঝুরি ছুটিয়ে অল্পেতুষ্ট এই মানুষগুলোকে চিরদিন শোষণ করতে, তারা চায় শ্রমিককে গোলাম বানিয়ে চিরকাল প্রভুত্ব করতে। তার চায় না শ্রমিককে সম্মান জনক আসন দিতে, তারা চায় না শ্রমিকের প্রাপ্যটা বুঝিয়ে দিতে। তারা ভয় পায় শ্রমিক তার সত্যিকার প্রাপ্যটা বুঝে পেলে, তার গোলামী করার মানসিকতা হারিয়ে যাবে। পরিনামে তাদের প্রভুত্বের দিনও শেষ হয়ে যাবে। ১৮৮৬ সালে পহেলা মে আমেরিকার শিকাগোতে আয়েজিত এক শ্রমিক সমাবেশে পুলিশের হামলায় কয়েজন শ্রমিকের করুণ মৃত্যু আর বহু সংখ্যক শ্রমিক আহত হওয়ার পর থেকে দিনটি পৃথিবীব্যাপি আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে প্রায় দেড়শত বছর ধরে। কিন্তু শ্রমিকের ভাগ্য বদলায়নি আজও। বদলাবেই বা কি করে? মালিক-শ্রমিকের পারস্পরিক সম্পর্ক যে বিপরিতমুখী! প্রভু আর গোলামের সম্পর্ক দূর করে ভ্রাতৃত্ব আর বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরী করা গেলেই কেবল শ্রমিক তার সত্যিকার মর্যাদা বুঝে পাবে এবং সমাজ ও সভ্যতা সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হবে। একমাত্র ইসলামই দিয়েছে মালিক আর শ্রমিক উভয়কে মর্যাদাপূর্ণ আসন।
শ্রমজীবি মানুষের মর্যাদা মহান আল্লাহর নিকট অনেক বেশি। তাইতো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ, নবী-রাসূলগণ জীবনের একটা বড় অংশ জুড়ে শ্রমিক পরিচয় বহন করেছেন। হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,“আল্লাহ এমন কোন নবী পাঠননি যিনি বকরী চরাননি। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, আর আপনি? রাসূলুল্লাহ (সা.) উত্তরে বললেন, হ্যাঁ, আমিও মক্কার লোকদের জন্য কিছু কিরাতের বিনিময়ে (স্বল্প মজুরিতে) বকরী চরাতাম। (সহীহ আল-বোখারী: ২২৬২) আলোচ্য হাদীস দ্বারা প্রমানিত হয় যে, সকল নবী ও রাসূল জীবনের কোন এক সময়ে বকরী চরানোর কাজটি করেছেন। তাছাড়াও কিছু নবী ও রাসূল তাঁদের জীবনে অনেক কষ্টকর শ্রমের মাধ্যমে জীবিকা উপার্যন করেছেন, যা পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমানিত। হযরত দাউদ (আ.) কর্মকারের কাজ করতেন। যেমন পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে,“আমি দাউদের প্রতি অনুগ্রহ করেছিলাম, আদেশ করেঠিলাম পর্বতমালাকে এই মর্মে যে, তোমরা দাউদের সাথে আমার পবিত্রতা ঘোষণা করো এবং পক্ষীকূলকেও। আর আমি তাঁর জন্য লোহাকে নরম করে দিয়েছিলাম। আমি তাঁকে বলেছিলাম, প্রসস্ত বর্ম তৈরী করো, কড়াসমূহ যথাযথভাবে সংযুক্ত করো। আর নেক আমল করো, নিশ্চয়ই তোমরা যা কিছু করো, আমি তা দেখি।”(সূরা সাবা: ১০-১১) হযরত মুসা (আ.) দীর্ঘদিন পর্যন্ত ভেড়া চরিয়েছেন, যার বর্ণনা পবিত্র কুরআনে দেয় হয়েছে। এরশাদ হয়েছে,“তিনি (হযরত শুআইব আ.) বললেন, আমি আমার এই দুই কন্যার একজনকে তোমার সাথে বিবাহ দিতে চাই এই শর্তে যে, তুমি আট বছর আমার মজুরি করবে, তবে তুমি যদি দশ বছর পূর্ণ করো, তবে সেটা তোমার ইচ্ছা। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। আল্লাহ চাহেন তো তুমি আমাকে সৎকর্মপরায়ন পাবে। তিনি (হযরত মুসা আ.) বললেন, আপনার ও আমার মধ্যে চুক্তি স্থির হলো। দু’টি মেয়াদের বমধ্য হতে যে কোন একটি পূর্ণ করলে আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকবে না। আমরা যা করছি, তাতে আল্লাহর উপর ভরসা।”(সূরা আল-কাসাস:২৭-২৮) আদি পিতা হযরত আদম (আ.) ছিলেন কৃষক। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে,“অনন্তর শয়তান তাঁদের দু’জনকে সেখান থেকে পদস্খলিত করলো ফলত: তাঁরা যে সুখ-স্বচ্ছন্দে সেখানে ছিলো তা হতে তাঁদেরকে বের করে দিলো এবং আমি তাঁদেরকে বললাম, তোমরা নেমে যাও। তোমরা পরস্পর একে অপরের শত্রু হবে এবং তোমাদেরকে সেখানে কিছুকাল অবস্থান করতে হবে ও পাথেয় সংগ্রহ করতে হবে।”(সূরা আল-বাক্বারাহ: ৩৬) অধিকাংশ তাফসীর কারকের অভিমত হলো, হযরত আদম ও হাওয়া (আ.) পৃথিবীতে নেমে আসার পরে তাঁদেরকে খাদ্য হিসেবে যমীন থেকে ফলমুল ও শষ্য গ্রহন করতে হতো। আর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ওই সময়ে যমীন থেকে কি ভাবে ফল ও ফসল উৎপাদন করতে হয়, সে বিষয় সম্পর্কিত ওহী নাযিল করা হতো। পবিত্র কুরআন ও হাদীস এবং ঐতিহাসিক বর্ণনা মতে নবীগণ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তাঁদেরকে শ্রমভিত্তিক পেশায় নিয়োজিত হতে হয়েছিলো জীবিকার প্রয়োজনে।
ইসলাম শ্রমিকের অধিকার সংরক্ষণে কিছু কার্যকর বিধিমালা প্রনয়ণ করেছে, যা সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা নিবন্ধের সংক্ষিপ্ত কলেবরে কয়েকটি বিষয় উপস্থাপন করবো। ১. সম্মানজনক জীবন নির্বাহে উপযুক্ত মজুরী প্রদানঃ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,“যে লোক আমাদের কোনো কাজে নিয়োজিত হয়, (বিবাহিত না হলে) সে যেনো বিয়ে করে নেয়। তার কোনো সেবক না থাকলে সে যেনো তা রেখে নেয়। তার যদি কোনো ঘর না থাকে তাহলে সে যেনো একটা ঘর বানিয়ে নেয়। এর চেয়ে বেশি যে গ্রহণ করবে সে হয় বিশ্বাস-ঘাতক না হয় চোর।” (সুনানে আবু দাউদ: ২৯৪৫) আলোচ্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, পেশাজীবী হিসেবে পদমর্যাদা অনুযায়ী উপযুক্ত বেতন, বাসস্থান, চিকিৎসা, বাহন, সেবক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়াদি পাওয়া প্রত্যেক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির ইসলাম স্বীকৃত অধিকার। আর সে অধিকার পূরণ করা নিয়োগ দানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব এবং সেটা নিশ্চিত করা সরকারের কর্তত্ব। ২. মজুর, শ্রমিক বা অধিনস্তদেরকে নিজের ভাই বা সন্তানের মতো মর্যাদা দেয়াঃ হযরত মারুফ ইবনে সুয়াইদ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি রবজা নামক স্থানে হযরত আবু যার গিফারী (রা.) এর সাথে সাক্ষাৎ করলাম। আমি দেখলাম, তাঁর গায়ে একজোড়া চাদর আছে এবং তাঁর গোলামের গায়েও হুবহু একই রকম একজোড়া চাদর আছে। আমি তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন; আমি এক ব্যক্তিকে গালি দিয়েছিলাম এবং তাকে তার মায়ের কথা উল্লেখ পূর্বক অপমান করেছিলাম। তখন নবী করীম (সা.) আমাকে বললেন,“ হে আবু যার! তুমি তাকে তার মায়ের কারণে অপমান করেছো? নিশ্চয়ই তোমার মধ্যে জাহেলিয়াতের কিছু অংশ রয়ে গেছে। জেনে রেখো, তোমাদের অধীনস্তরা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। সুতরাং যার অধীনে তার কোন ভাই আছে, সে যেনো তাকে নিজের খাবার খাওয়ায়, নিজে যে ধরনের পোশাক পরে একই পোশাক তাকে পরায়। তাদের উপর এমন কোনো কাজ চাপিয়ে দিও না যা তাদের জন্য কষ্টকর। আর যদি এমন কাজ দাও, তাহলে তাদেরকে সাহায্য করো।”(সহীহ আল-বোখারী: ৩০, সহীহ মুসলিম: ১৬৬১) ৩. অধীনস্তদেরকে প্রহার করা যাবে নাঃ হযরত আবু মাসউদ আল-আনসারী (রা.) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি একদিন আমার এক গোলাকে প্রহার করছিলাম। এমন সময়ে পেছন থেকে কাউকে বলতে শুনলাম, মনে রেখো হে আবু মাসউদ! তার উপর তোমার যতোটুকু ক্ষমতা আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতা তোমার উপর আল্লাহর রয়েছে। আমি পেছন ফিরে দেখলাম, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)। আমি সাথে সাথে বললাম, ‘সে আল্লাহর ওয়াস্তে আযাদ’ হে আল্লাহর রাসূল! তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তুমি এমনটি না করলে জাহান্নামের আগুন তোমাকে পুড়িয়ে দিতো অথবা বললেন, জাহান্নামের আগুন তোমাকে স্পর্শ করতো।”(সহীহ মুসলিম: ১৬৫৯)
শ্রমিকের অধিকার পহেলা মে আর রাজ পথের মিছিল-র্যালি, সেমিনার-সমাবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ইসলামের সাম্যবিধানের আলোকে প্রতিষ্ঠিত হোক স্থায়ীভাবে, সকল পর্যায়ে। মালিক-শ্রমিকের আত্মার বন্ধনে দেশ ও জাতি চিরকালের জন্য মুক্তি পাক বৈষম্যে ভরা অমানবিক সমাজ ব্যাবস্থা থেকে।
লেখক: পেশ ইমাম ও খতীব, রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ।
