বিশ্ববিদ্যালয়ে সংযমই শ্রেয়
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর রাজধানীর শাহবাগ থানার সামনে ডাকসুর সমাজসেবা স¤পাদক এ বি জুবায়ের এবং সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক স¤পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ হামলা ও মারধরের শিকার হয়েছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সমর্থনে তারা বিজয়ী হন। হামলার কারণ সম্পর্কে ডাকসুর সাধারণ স¤পাদক ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার স¤পাদক এস এম ফরহাদ সাংবাদিকদের বলেছেন, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বহিরাগতদের নিয়ে এ বি জুবায়ের ও মুসাদ্দিকের ওপর হামলা করেছে। কেন এই ঘটনা ঘটেছে, এ ব্যাপারে ফরহাদ জানান, ঈশান চৌধুরী নামে ছাত্রলীগের একটি আইডি থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ একটি পোস্ট দেয়া হয়। পরবর্তীতে অরণ্য আবির নামে একটি আইডি থেকে পোস্টটি ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্যানেল থেকে ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আবদুল্লাহ আল মাহমুদ দিয়েছে বলে প্রচার করা হয়। বিষয়টি মাহমুদ নিজের আইডি থেকে ক্লিয়ার করেন। এরপরও ছাত্রদল তাকে হুমকি দিয়ে আসছিল অভিযোগ করে এস এম ফরহাদ বলেন, মাহমুদ শাহবাগ থানায় জিডি করতে গেলে তাকে এক ঘণ্টার বেশি সময় বসিয়ে রেখে জিডি নেয়া হয়নি। গত কয়েকদিন ধরে বেশ কিছু ইস্যুতে দেশের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। কয়েক দিন আগে চট্টগ্রাম সিটি কলেজে একটি দেয়াল লিখনের আগে ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখা নিয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে লাঠিসোঁঠা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘাত হয়। এ ঘটনার রেশ ধরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে পাল্টাপাল্টি মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে। এ ঘটনার অবসান হতে না হতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে অত্যন্ত অশালীন ও বিকৃত মানসিকতার একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে দেয়া হয়, যা কোনো সভ্য ও সুস্থ মানুষের পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মাহমুদের টাইম লাইনে দেয়া এই পোস্টকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলসহ সচেতন মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। যদিও বলা হচ্ছে, আবদুল্লাহ আল মাহমুদ তা ক্লিয়ার করেছেন। এটা সবারই জানা, একবার টাইম লাইনে কোনো পোস্ট বা ফটোকার্ড প্রকাশ করলে তা মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে তা ডিলিট করলেও নেটিজেনদের কাছে তার স্ক্রিনশট থেকে যায়। আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের দেয়া পোস্টের স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তার তীব্র প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদের ঝড় উঠে। এ নিয়ে তিনি হুমকি-ধমকির জেরে শাহবাগ থানায় জিডি করতে গেলে উদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, বিতর্ক তৈরি হয় কিংবা সমাজকে অশান্ত করে তুলতে পারে, এমন বিষয়ে কোন পোস্ট দেয়া বা শেয়ার করা কোনো বিবেকী মানুষের কর্ম হতে পারে না। গঠনমূলক রাজনৈতিক বিরোধিতা ও সমালোচনা বাকস্বাধীনতার অংশ। তবে বাকস্বাধীনতার নামে অসভ্যতা সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে অবশ্যই সমালোচনা হতে পারে। তবে তা গঠনমূলক ও যৌক্তিক হওয়া বাঞ্ছনীয়। কেবল বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করতে গিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং সীমালংঘন কোনো সভ্যতা ও যৌক্তিকতার প্রমাণ বহন করে না। জাইমা রহমানকে নিয়ে এর আগেও একাধিকবার কুরুচিপূর্ণ পোস্ট ও ফটোকার্ড ছড়ানো হয়েছে। তবে তাকে নিয়ে গত বৃহস্পতিবার যে ফটোকার্ড ছড়ানো হয়েছে, তা কোনো সভ্যতার মাপকাঠিতে পড়ে না। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাত্রদলসহ বিএনপির সকল অঙ্গসংগঠনকে যেকোনো পরিস্থিতিতে এবং উসকানিমূলক ঘটনায় সংযত থাকার নির্দেশনা আগেই দিয়েছেন। তারা এ নির্দেশনা মেনে চলার চেষ্টা করেছে। গত বৃহস্পতিবার জাইমা রহমানকে নিয়ে সভ্যতাবিবর্জিত যে ফটোকার্ড ছড়ানো হয়েছে, তা কোনো সুস্থ মস্তিস্কের মানুষের পক্ষে চুপ থাকা কঠিন। ছাত্রদলের নেতাকর্মী ও বিক্ষুব্ধ মানুষ তাতে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। যদিও হামলা ও সংঘর্ষ কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। এর বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নেয়া যেত। যে বা যারাই এই ফটোকার্ড ছড়িয়েছে, তা যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনাই ছিল শ্রেয়। অন্যদিকে, ছাত্রশিবির যে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, তাতে এটা মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, সে অন্যের দোষ নিজের স্কন্ধে নিচ্ছে। চট্টগ্রাম সিটি কলেজে ‘গুপ্ত’ লেখা নিয়ে সংগঠনটির প্রতিক্রিয়া থেকে সেটাই প্রতীয়মান হচ্ছে। সংগঠনটির কেন মনে করছে, ‘গুপ্ত’ শব্দটি তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য? সে তো প্রকাশ্যেই রাজনীতি করছে। ফলে তার এ নিয়ে সংঘাতে জড়ানোর কোনো কারণ নেই। জাইমা রহমানের ফটোকার্ড নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়াও অনুরূপ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। প্রত্যেক কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পারস্পরিক সহাবস্থান এবং সুস্থ্য ছাত্ররাজনীতির বিকল্প নেই। এখানে যে যার আদর্শিক রাজনীতি করবে এবং সুস্থ্য ও গঠনমূলক যুক্তিতর্কের মাধ্যমে তা তুলে ধরবে। তবে তা সীমাছাড়া এবং সংঘাতের পর্যায়ে চলে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহামনের কন্যা জাইমা রহমান উচ্চশিক্ষিত, মার্জিত এবং বিনয়ী। তার এই আচরণ ইতোমধ্যে দেশের মানুষকে আকৃষ্ট করেছে। তিনি প্রায়ই তরুণ প্রজন্মের সাথে বিষয়ভিত্তিক এবং মোটিভেশনাল আলোচনা ও মতবিনিময়ে অংশগ্রহণ করেন। সমাজ ও দেশ গঠনে তাদের ভূমিকা রাখতে এবং এগিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন। সর্বোপরি, তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং অবিসংবাদিত নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাতনি। তিনি এখনো পারিবারিক আবহে বসবাস করছেন। রাজনীতিতে জড়াননি। তার কোনো কর্মকা- এখন পর্যন্ত বিতর্ক তৈরি করেনি। তার পিতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমালোচনা করতে গিয়ে যখন তাকে টার্গেট করা হয় এবং কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য কিংবা ফটোকার্ড ছড়িয়ে দেয়া হয়, তখন তা অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে এটাই প্রতীয়মান হয়, একটি গোষ্ঠী সরকারকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে কিংবা যৌক্তিক ও গঠনমূলক সমালোচনা করতে ব্যর্থ হয়ে পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অশালীন ও বিকৃত রুচির পথ বেছে নিয়েছে। এটা তাদের রাজননৈতিক দেউলিয়াত্ব প্রকাশ করছে। ন্যাক্কারজনক এই ঘটনা যেকোনো সাধারণ পরিবারের ক্ষেত্রেও অগ্রহণযোগ্য। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে যে উত্তেজনা বিরাজ করছে, তা নিরসনে উভয় পক্ষকেই সর্বোচ্চ সংযম ও সহনশীলতা প্রদর্শন করতে হবে। ক্যাম্পাসকে অশান্ত করতে কারা ষড়যন্ত্র করছে, কারা উসকানি দিচ্ছে, তা খুঁজে বের করা ও সতর্ক থাকা উভয় পক্ষেরই দায়িত্ব। চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতি শান্ত করতে অভিভাবক হিসেবে সরকারিদল ও বিরোধীদলের হস্তক্ষেপও জরুরি।
