|

সবুজ সাহারা যেভাবে মরুভূমি হলো

সাহারা মরুভূমি বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে তপ্ত সূর্য, মাইলের পর মাইল বালিয়াড়ি আর দু-একটি মরূদ্যান। কিন্তু ১০ হাজার বছর আগেও উত্তর আফ্রিকার এই বিশাল ভূখণ্ডটি ছিল সম্পূর্ণ অচেনা। তখন এটি ছিল একটি সবুজ চারণভূমি, যেখানে ছিল অসংখ্য হ্রদ, নদী, তৃণভূমি ও অরণ্য। প্রশ্ন থাকে, সেই বিপুল জলরাশি আর সবুজের সমারোহ কোথায় হারিয়ে গেল।

প্রত্নতত্ত্ববিদ ডেভিড রাইট চাঞ্চল্যকর নতুন তত্ত্ব জানিয়েছেন। তাঁর মতে, সাহারা মরুভূমি হওয়ার পেছনে কেবল প্রাকৃতিক কারণ নয়, বরং মানুষ ও তাদের পালিত গবাদিপশুরও বড় ভূমিকা থাকতে পারে। ফ্রন্টিয়ার্স ইন আর্থ সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় রাইট যুক্তি দেখিয়েছেন, মানুষের কর্মকাণ্ডই সাহারার এই নাটকীয় রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করেছে।

পৃথিবীর কক্ষপথের ঘূর্ণনের পরিবর্তনের ফলে সাহারায় পর্যায়ক্রমে আর্দ্রতা ও শুষ্কতা দেখা দেয়। একে বলা হয় আফ্রিকান হিউমিড পিরিয়ড। সাহারা যখন সবুজ থেকে মরুভূমিতে পরিণত হতে শুরু করে, তখন কিছু কিছু অঞ্চলে এই পরিবর্তনের গতি ছিল অস্বাভাবিক দ্রুত। বিজ্ঞানী রাইট লক্ষ করেছেন, যেখানেই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে গবাদিপশু পালনকারী মানুষের উপস্থিতি পাওয়া গেছে সেখানেই গাছপালার ধরনে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে।

বিজ্ঞানী রাইটের ধারণা, গবাদিপশু দিয়ে অতিরিক্ত ঘাস খাওয়ানোর ফলে বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা কমে যায়। গাছপালা প্রস্বেদনের মাধ্যমে যে আর্দ্রতা বাতাসে ছাড়ে তা মেঘ তৈরি করে। চারণভূমি ধ্বংস হওয়ায় সেই প্রক্রিয়া থমকে যায় এবং ভূমি থেকে সূর্যের আলোর প্রতিফলন বেড়ে যায়, যা বৃষ্টিপাত কমিয়ে দেয়। এ ছাড়া যাযাবর মানুষেরা বন পরিষ্কার করতে আগুনের ব্যবহার করত, যা মরুভূমি তৈরির প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করেছে।

অনেক বিজ্ঞানী অবশ্য রাইটের এই তত্ত্বের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-বিজ্ঞানী জেসিকা টিয়ার্নি মনে করেন, মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াও সাহারা আজ মরুভূমিই হতো, কারণ পৃথিবীর কক্ষপথের পরিবর্তন সেদিকেই নির্দেশ করছিল। ধূলিকণা ও গাছপালার প্রাকৃতিক ফিডব্যাক লুপ এই দ্রুত পরিবর্তনের কারণ হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেই হয়তো শিকারি-সংগ্রাহক মানুষরা খাদ্যের অভাবে পশু পালনের দিকে ঝুঁকেছিল।

এই রহস্যের সমাধান করতে বিজ্ঞানীরা সাহারার শুকিয়ে যাওয়া হ্রদগুলোর তলদেশ খনন করে সেখান থেকে প্রাচীন পরাগরেণু ও বীজের নমুনা সংগ্রহ করছেন। সেই তথ্যের সঙ্গে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মিল পাওয়া গেলে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে। বর্তমান যুগের জলবায়ু পরিবর্তন মূলত গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে হলেও, সাহারার এই ইতিহাস থেকে মানুষের পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে অনেক কিছু শেখার আছে।
সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *