ভারত ও হাসিনার ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি রচনায় ওয়ান-ইলেভেন সরকার যেভাবে ভেস্তে গিয়েছিলো জিয়া পরিবার ‘মাইনাস’ ফর্মূলা    

ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর ডিজাইনে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি রচনা করেছিলো ভারত সমর্থিত ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দীন নেতৃত্বাধীন ‘ওয়ান-ইলেভেন’ সরকার। দুর্ভেদ্য সেই পরিকল্পনাকে ভেস্তে দেয়ার নেপথ্যে কাজ করেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শের সৈনিক কয়েকজন সাবেক ছাত্রদল নেতা। বিরুদ্ধ স্রোতের মধ্যে থেকেও অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ওয়ান-ইলেভেন সরকার ও বিএনপি’র সংস্কারপন্থিদের পরিকল্পনা গুড়িয়ে দিতে নিজ অবস্থানে থেকে ভূমিকা রাখেন। বেগম খালেদা জিয়াও সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রান্তিক পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের পরামর্শ নিয়ে তখন দূরদর্শী এবং দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ওই সময় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানাযায় রাজনৈতিক উত্থান-পতন এবং বিভ্রান্তিকর সেই মুহুর্তগুলোর নেপথ্য-কথা।

ভূ-রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ একটি ট্রায়াঙ্গেলের মুখে । দেশের তেল গ্যাস সহ প্রাকৃতিক সম্পদ লুটে নেয়ার লক্ষ্যে ‘ডিপ-স্টেট’র কূটনীতির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিষয়টির শুরু বেশ আগে। কিন্তু এ মুহূর্তে দেশের ওপর ভারতের শকুণি দৃষ্টি প্রখর। যার শুরুটা হয়েছিলো ২০০০ সালের পর পর। হালের নিষিদ্ধ আ’লীগকে চিরস্থায়ীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রাখার বন্দোবস্ত করতে ভারত সরকার ১৯৪৭ সাল থেকেই নানা আঙ্গিকে কাজ করছে। এর সঙ্গে ইন্দো-মার্কিন রাজনীতির সমীকরণ স্পষ্ট। ২০০১ সালে আ’লীগের রাষ্ট্রক্ষমতা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ন্যস্ত হওয়ার পর থেকেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে একটি জটিল সমীকরণ। ভূ-রাজনৈতিক অঙ্ক কষা শুরু হয় তখন থেকে। কিন্তু সেই সময়কার বাস্তবতায় ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’ তথা চার দলীয় জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে ২০০১ সালের অক্টোবরে। দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের স্বাভাবিক আমল-আখলাককে ‘জঙ্গিবাদের উত্থান’ তকমা দিয়ে ভারত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় একটি ছক আঁকে। ছক অনুযায়ী ২০০২ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত কার্যক্রম শুরু করে। এ সময় ‘ইসলাম ফোবিয়া’য় আসক্ত আ’লীগ ‘জঙ্গিবাদ’ ইস্যু বাজারে ছাড়ে। অবশ্য এই ‘জঙ্গিবাদ’ তকমার সঙ্গে দেশের কিছু মুসলমান নামধারী নির্বোধ মানুষেরও সম্পৃক্ততা লক্ষ্য করা যায়। এদেরকে সামনে রেখে আধিপত্যবাদী ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলার নাটক মঞ্চস্থ করে। এর পরপরই সংসদে বিরোধী দলের সম্মান নিয়ে রাজপথে ছিলো আওয়ামীলীগ। দলটির তৎকালিন মহাসচিব আব্দুল জলিল ‘ট্রাম্পকার্ড-তত্ত্ব’ মার্কেটে ছাড়া হয়। পরপর বাজারে ছাড়া হয় ‘গ্রেনেড হামলা’, ‘দশ ট্রাক অস্ত্র’ কাহিনী। পরপর ছড়িয়ে দেয়া হয় ‘হাওয়া ভবন’ নামের আষাঢ়ে গল্প। আ’লীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যাকাণ্ড’, সিলেট মাজারে ব্রিটিশ কূটনীতিক আনোয়ার চৌধুরীর ওপর বোমা হামলা, রমনা বটমূলে বোমা হামলা, শামীম ওসমানের সভায় বোমা হামলার নাটকও মানুষকে বিভ্রান্ত করতে ‘টনিক’ হিসেবে কাজ করে। শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আ’লীগ একটি যুৎসই অজুহাতের জন্য ওঁৎ পেতে ছিলেন। আর অমনি সামনে আসে বিচারপতিগণের বয়স বৃদ্ধির ‘ইস্যু’। যাতে রাজনৈতিক গন্ধ আবিষ্কার করেন শেখ হাসিনা। তারা ছক কষে ফেলে বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানোর বিষয়টি ইস্যু তৈরির।

২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদের চার দলীয় জোট সরকারের সময় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ যে ৫শ’ কোটি টাকার ‘প্রকল্প’ হাতে নেয় ওই প্রকল্পের টাকায় বাস্তবায়ন শুরু হয় ভারতীয় দুরভিসন্ধির। ২০০৬ সালের অক্টোবরে রাজধানীর পল্টনে আ’লীগ বাম দলগুলোকে নিয়ে চালায় প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে চালায় ‘লগি বৈঠার তা-ব’। সাপ পিটিয়ে মারার মত লগি-বৈঠা দিয়ে মানুষ হত্যার পৈশাচিক উল্লাস তখন সভ্য দুনিয়াকে অবাক করেছে। সারা দেশ ঠান্ডা থাকলেও শুধুমাত্র পল্টনের তা-ব দিয়ে বিশ্ব মিডিয়ায় তোলা হয় ঝড়। বাপ্পাদিত্য বসুরা লাশের ওপর উদ্দাম নৃত্য করেন। অথচ ভিলেন হিসেবে আনা হয় টুপি-দাড়ি ওয়ালা নিরীহ মানুষ এবং হত্যাকা-ের শিকার ব্যক্তিদেরকেই। বর্বর এই হত্যাকাণ্ড সংঘটনের মধ্য দিয়ে মূলত: এই বার্তা দেয়া হয় যে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিএনপি জোট সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই ! আর এই ঘটনাকে ক্ষমতা কেড়ে নেয়ার ছুতো হিসেবে দেখিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করে ফখরুদ্দীন-মঈনউদ্দিন নেতৃত্বাধীন ‘তত্ত্বাবধায়ক’ সরকার। যা ‘ওয়ান-ইলেভেন সরকার’ নামেই অধিক পরিচিত। এটি ছিলো ভারত-যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতঘেষা বুদ্ধিজীবীদের সমর্থিত একটি ‘শংকর জাতের’ সরকার। ওই সময় আ’লীগ মব সংস্কৃতি ও নারকীয় তা-ব চালু করে। তার মঈন উদ্দিন-ফখরুদ্দীনের ক্ষমতা গ্রহণের পক্ষে জনমনে একপ্রকার সম্মতি উৎপাদন করে। ওয়ান-ইলেভেন সরকার ক্ষমতায় এসেই সর্বত্র ‘সংস্কার’ করার তত্ত্ব ছড়িয়ে দেয়। এ সরকার এক বছরের মাথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে পশ্চাদদেশে লাথি খায়। ফলে দু’ বছরের বেশি টিকতে পারেনি।

এদিকে সংস্কারের নামে ফখরুদ্দিন-মঈন উদ্দিনের সরকার একটি ‘গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ নামে ‘জাতীয় কমিটি’ গঠন করে। এই কমিটির নেতৃত্ব দেন মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুল মতিন ও জেনারেল মাসুদ উদ্দীন চৌধুরী। তাদের আওতায় গঠিত হয় একটি ‘টাস্কফোর্স’। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের সামনে রেখে গঠন করা হয় ‘টাস্কফোর্স’। এতে সেনাবাহিনী, নৌ বাহিনীর, বিমান বাহিনীর মেজর পদমর্যাদার কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করেন। এদের সাথে সদস্য হিসেবে কাজ করেছে পুলিশ বিভাগ, রাজস্ব বিভাগ, ব্যাংকার, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আওতায় থাকা বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর কর্মকর্তা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তাগণ। ‘গুরুতর অপরাধ দমন’র আওতায় গঠিত টাস্ক ফোর্সের ২৩ নং গ্রুপে ( যার নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালিন মেজর মোস্তফা। পরবর্তীতে মেজর জেনারেল এবং বিটিআরসির চেয়ারম্যান) ওয়ার্ড কাউন্সিলর মির্জা খোকন, মুন্সি আনোয়ারুল ইসলাম, সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক ওসমান গনি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিষয় নিয়ে কাজ করেন। টাস্কফোর্সের এই টিমে দুদকের পক্ষে ছিলেন তৎকালিন উপ-পরিচালক গোলাম শাহরিয়ার চৌধুরী। তাদের অনুসন্ধানলব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ২০০৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাতে কথিত ‘হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি’র মামলা দায়ের করা হয়। বেগম খালেদা জিয়াসহ এজাহারে আসামি করা হয় ১৫ জনকে। তারা হলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো,তৎকালিন মন্ত্রী কর্নেল (অব.) আকবর হোসেনের স্ত্রী জাহানারা আকবর, আকবর হোসেনের পুত্র ইসমাইল হোসেন সায়মন, একেএম মুসা কাজল, গ্যাটকো’র পরিচালক শাহজাহান এম.হাসিব, সৈয়দ তানভীর আহমেদ, সৈয়দ গালিব আহমেদ, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তৎকালিন সদস্য আহমেদ আব্দুল কাশেম, তৎকালিন নৌপরিবহন সচিব জুলফিকার হায়দার চৌধুরী,চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তৎকালিন চেয়ারম্যান কমোডর জুলফিকার আলী,এএসএম শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তৎকালিন সদস্য একে রশিদ উদ্দিন আহমেদ, তৎকালিন পরিচালক এসএম সানোয়ার হোসেন এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তৎকালিন সদস্য লুৎফুল কবির। ‘গ্লোবাল অ্যাগ্রো ট্রেড (প্রা:) কোম্পানি লি:’ এর সংক্ষিপ্ত রূপ হচ্ছে ‘গ্যাটকো’। ‘গ্যাটকো মামলা’খ্যাত মামলার বিষয়বস্তু হচ্ছে, ২০০৪ সালে ঢাকা আইসিডি এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় আইসিডি ইয়ার্ডে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের টেন্ডার সংক্রান্ত। ক্ষমতায় থাকাকারে বিএনপি সরকার গ্যাটকোকে কার্যাদেশ প্রদানের মাধ্যমে মাধ্যমে দুর্নীতি করেছে-মর্মে দুদকের এজাহারে অভিযোগ আনা হয়। সূত্র: ইনকিলাব

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট