বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও বাংলাদেশে কমে না কেন?
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশেও সেটার দাম বাড়তে দেখা যায়। কিন্তু দাম যখন কমে, তখন সেটির প্রভাব খুব একটা দেখা যায় না বলে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন ক্রেতারা। তাদের এই অভিযোগ যে একেবারে অমূলক নয়, সেটির পক্ষে বিভিন্ন সময় নানান তথ্যপ্রমাণও সামনে আসতে দেখা গেছে।ক্ষমতাগ্রহণের পর গত সাত মাসে তিন দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে বিএনপি সরকার। এর মধ্যে সবশেষ দাম বাড়ানো হয়েছে গত ২০শে সেপ্টেম্বর, যা পরদিন থেকে কার্যকর হয়েছে।এ দফায় সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে একলাফে ২০ টাকা বেড়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলে দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।কিন্তু এমন একটি সময় এই বাড়ানো হয়েছে, যখন বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ব্যারেলপ্রতি দাম আগের চেয়ে আট মার্কিন ডলার কমে ১০১ ডলারে নেমে এসেছে।কিন্তু বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমার পরও বাংলাদেশ সেটির প্রভাব সেভাবে দেখা যায় না কেন? কোন বিবেচনায়, কীভাবে এখানে তেলের দাম নির্ধারিত হয়? দাম নির্ধারণের যত প্রক্রিয়া: আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিয়মিতভাবেই ওঠা-নামা করে। কেনার পর আমদানিকারক দেশগুলো বেশকিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিজেদের বাজারে ওই তেলের একটি সরবরাহ মূল্য বা খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে থাকে।খুচরা পর্যায়ে তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রধানত তিনটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। সেগুলো হলো: মূল্য সমন্বয়, সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ এবং একদর পদ্ধতি।এর মধ্যে বেশিরভাগ দেশেই ‘মার্কেট ডিটারমাইন্ড’ বা বাজার দরের সঙ্গে সমন্বয় করে তেলের প্রতি লিটারের বিক্রি মূল্য নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।এর বাইরে, কিছু দেশে একটি ‘প্রাইস সিলিং’ বা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেয়।এছাড়া কোথায়ও কোথাও ফিক্সড প্রাইস বা একদর পদ্ধতি অনুসরণ করেও তেলের দাম নির্ধারিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে তেলের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, যা হুট করে পরিবর্তনের সুযোগ সেভাবে থাকে না।বাংলাদেশে কয়েক বছর আগে পর্যন্ত একদর পদ্ধতিতে জ্বালানি তেলের দাম ঠিক করে আসছিল দেশটির সরকার। দাম নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) হাতে।আইন অনুযায়ী, প্রতিবার দাম বাড়ানোর আগে তাদেরকে প্রায় তিনমাস সময় নিয়ে গণশুনানি করতে হতো। সেখানে যুক্তি-তর্ক শেষে একটি দাম নির্ধারিত হতো।তবে তেলের দামের ওঠা-নামা বরাবরই নির্ভর করে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের ওপর।আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দাম বাড়লে বাংলাদেশেও যেমন বাড়ানো হয়, তেমনি মূল্য কমলে এখানেও দাম কমাতে দেখা গেছে।তবে বিভিন্ন সময় দাম যেভাবে বাড়ানো হয়েছে, পরবর্তীতে সেভাবে কমতে দেখা যায়নি।যেমন: বিশ্ববাজারের সঙ্গে মিল রেখে ২০২২ সালের পাঁচই অগাস্ট রাতে সারাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছিল তৎকালীর আওয়ামী লীগ সরকার।তখন ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ৩৪ টাকা, অকটেনের দাম লিটারে ৪৬ টাকা আর পেট্রলের দাম লিটারে ৪৪ টাকা বাড়ানো হয়।সেই সময় বিশ্ববাজারে ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম নেমে এসেছিল ৯৫ ডলারে। তার কয়েক সপ্তাহ আগে অবশ্য ব্যারেল প্রতি তেলের দাম উঠেছিল ১২৯ ডলার পর্যন্ত।মূল্যবৃদ্ধির সপ্তাহ তিনেক পর সব ধরনের তেলের দাম লিটারে কমানো হয়েছিল মাত্র পাঁচ টাকা।কিন্তু পরবর্তীতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি অনেক কমে এলেও দেশের বাজারে দাম সেভাবে কখনোই কমানো হয়নি। এখন নির্ধারিত হচ্ছে কীভাবে?২০২২ সালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশে নির্বাহী আদেশে ২০২২ সালের জ্বালানি তেলের দাম একলাফে অনেক বাড়িয়ে দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। বিষয়টি তখন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। একপর্যায়ে নতুন অধ্যাদেশ জারি করে বিইআরসি আইন সংশোধন করা হয় এবং ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ উল্লেখ করে নির্বাহী আদেশে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা সরকার নিজের হাতে নিয়ে নেয়। এ দফায় দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে গণশুনানির বদলে সমন্বিত মূল্য সমন্বয় পদ্ধতি চালু করা হয়।
বিইআরসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রবিধিমালার খসড়াও সেখানে আটকে রয়েছে।“তারা এটার অনুমোদন দিয়ে দিলেই তখন আইন অনুযায়ী আমরা জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে ব্যবস্থা নিতে পারবো,” বলেন বিইআরসি’র চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।বিষয়টি নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।এদিকে, গত দুই বছর ধরে স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় পদ্ধতিতে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করে আসছিল বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু এ দফায় সেটি ঘটেনি।এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গত সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় পদ্ধতি পুরোপুরিভাবে অনুসরণ করতে গেলে তেলের দাম আরও বেড়ে যেত। সেজন্যই তারা এবার পদ্ধতিটি অনুসরণ করেননি।কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পরেও গত পাঁচ মাস দেশে তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এর ফলে গত মার্চ থেকে অগাস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।বিপুল পরিমাণ এই লোকসান কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি তেলের চোরাচালানের ঝুঁকি হ্রাসের কথা মাথায় রেখে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।“এমতাবস্থায় সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার স্বার্থে এবং প্রবাসী ভাইদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় ক্রয়কৃত জ্বালানি তেল যেন প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে যেন পাচার হয়ে যেতে না পারে সে কারণে সরকারকে এই জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে” বলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সূত্র: বিবিসি বাংলা
