সম্পাদকীয়

আদালতের কার্যক্রমে সমন্বয় ও গতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন এক নম্বর বেঞ্চে একটি মামলার নির্দেশনাকে কেন্দ্র করে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি ও ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকনের মধ্যে এক প্রকার বচসা হয়েছে। তথ্য গোপন করার অপরাধে একটি রিট মামলার বাদী ও আইনজীবীকে ৫ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা জরিমানার আদেশ দেয়ার পর এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন জরিমানা মওকুফের আবেদন জানানোর সময় আপিল বিভাগে বেঞ্চ ও বিচারক স্বল্পতা, বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা এবং আইনজীবীদের আয় কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি প্রধান বিচারপতির সময়কালে এসব সমস্যা হচ্ছে মর্মে অভিযোগ করলে প্রধান বিচারপতি তাঁর এ বক্তব্যকে আদালত অবমাননার সামিল বলে আখ্যায়িত করে বেঞ্চের অপরাপর বিচারপতিসহ এজলাস ত্যাগ করেন। গত মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২ টায় সুপ্রিম কোর্টে এ ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশের বিচার বিভাগে এ ধরনের ঘটনা নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্ট মামলায় প্রধান বিচারপতির জরিমানার রায় প্রসঙ্গে কিছু না বললেও এ ঘটনার মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগের প্রধান দু’টি পক্ষ বিচারক ও আইনজীবীদের কর্মকা-ে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা ও পারস্পরিক অসন্তোষের চিত্রই বেরিয়ে এসেছে। প্রধান বিচারপতির একটি নির্দেশনার নেপথ্যে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর তথ্য গোপন করার ঘটনা যেমন উঠে আসে, অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতির বক্তব্যে বিচারক স্বল্পতা, আইনজীবীদের আয় কমে যাওয়া এবং মামলার দীর্ঘসূত্রিতাসহ বেশকিছু সমস্যার চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনাটি নজিরবিহীন ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী হওয়ায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্থান থেকে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপে সমাধানের পথ বেরিয়ে আসবে বলে দেশের জনগণের প্রত্যাশা।

বৈষম্য, নিপীড়ন ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বিচারাঙ্গণই হচ্ছে মানুষের শেষ আশ্রয় ও ভরসার স্থল। বিগত সময়ে আওয়ামী স্বৈরাচারী সরকার দেশের সব প্রতিষ্ঠানের মতো দেশের বিচার বিভাগকেও দলীয় ফ্যাসিবাদের অনুঘটকে পরিণত করেছিল। আমাদের বিচার বিভাগের এহেন দৈন্য, রাজনৈতিক পক্ষপাত ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি একদিনে বা এক দশকেই দেখা দেয়নি। স্বাধীনতাত্তোর কালে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে একদলীয় ফ্যাসিবাদে পরিণত করার মধ্য দিয়ে এই সংকট সৃষ্টি করা হয়েছিল। অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় বিচারক নিয়োগ, বিচারকদের নীতিভ্রষ্টতা ও শপথভঙ্গের অনেক উদাহরণ রয়েছে। দেশের মানুষ ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। জুলাই অভ্যুত্থান পরিবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা যেমন অনেক বেশি, একইভাবে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের প্রত্যাশার বিষয়গুলো এখনো অধরাই রয়ে গেছে। আদালত কক্ষে প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতির কথিত বচসা এবং মতভিন্নতার বিষয়গুলো দেশের বিচারাঙ্গনের বিদ্যমান সমস্যা ও সংকটগুলোকেই জাতির সামনে তুলে ধরেছে। এখানে বিচারাঙ্গনের দুটি সম্পূরক পক্ষ বিচারক ও আইনজীবীদের স্বার্থ বা সমন্বয়হীনতার চিত্র ধরা পড়লেও এর প্রধান শিকার বিচারপ্রার্থী ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। বিচারক স্বল্পতা, বেঞ্চ স্বল্পতা, মামলার গতিহীনতা এবং আইনজীবী ও বিচার প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। এ থেকে উত্তরণে রাষ্ট্রকে অবশ্যই ত্বরিৎ পদক্ষেপ নিতে হবে।

সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতির বক্তব্যে আপিল বিভাগের বিচারক সংখ্যা ও বেঞ্চ সংখ্যা আগের চেয়ে কমে যাওয়ার চিত্র বেরিয়ে এসেছে। যত দিন যাচ্ছে, আদালতে মামলার সংখ্যা বা মামলা জট বাড়ছে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় এর সুষ্ঠু সমাধান অসম্ভব। যেখানে নিম্ন আদালত থেকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পর্যন্ত বিচারকের সংখ্যা আদালত ও বেঞ্চের সংখ্যা মামলা অনুপাতে বাড়ানো প্রয়োজন, সেখানে বিচারক ও বেঞ্চ কমিয়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। ‘জাস্টিস ডিলেইড জাস্টিস ডিনাইড’ এই পুরনো আপ্তবাক্যটি আমাদের বিচার ব্যবস্থার জন্য সর্বাংশে প্রযোজ্য। একেকটি মামলার শুনানি, সাক্ষ্য গ্রহণ, বিচারিক ধাপ অতিক্রম ও রায়ের জন্য বিচারপ্রার্থীর দশকের পর দশক আদালতের বারান্দায় দৌড়াতে দৌড়াতে জীবন শেষ হয়ে গেলেও বিচার শেষ হয় না। এর দায় শুধু বিচারকদের নয়, একশ্রেণীর আইনজীবী অস্বচ্ছতা ও তথ্য গোপন করার মধ্য দিয়ে বিচারব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত ও বাধাগ্রস্ত করছেন। এই মুহূর্তে দেশের আদালতগুলোতে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। মামলা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়লেও নিস্পত্তির হার খুবই কম। এভাবে চলতে থাকলে দেশের বিচারব্যবস্থা মানুষের আস্থা হারাতে পারে। সামাজিক-রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, নৈতিক অবক্ষয় ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের প্রভাব বিচারাঙ্গনকেও কলুষিত করেছে। বিচারাঙ্গনকে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করে স্বচ্ছতা, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে এ থেকে উত্তরণের কোনো পথ নেই। বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা যেমন জরুরি, তেমনি আইনজীবীদের রাজনৈতিক পক্ষপাত ও আদালত পাড়ায় বিচারিক বিষয়ের চেয়ে দলীয় রাজনৈতিক কর্মকা-ে লিপ্ত থাকার প্রবণতা সমর্থনযোগ্য নয়। হাই কোর্টে শুধুমাত্র সরকারি দলের সমর্থক আইনজীবীরাই একাধিক ধারায় বা উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। এটর্নি জেনারেলের অফিস, সুপ্রিম কোর্ট বার, সাধারণ আইনজীবী, বিচারক ও বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে সমন্বয়, সুসম্পর্ক ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বিচার প্রক্রিয়ায় অহেতুক সময়ক্ষেপণে প্রার্থীদের ভোগান্তি বিচারহীনতারই নামান্তর। বিচার ব্যবস্থাকে গতিশীল করার মাধ্যমে মামলা জট কমিয়ে এনে মানুষের ভোগান্তি লাঘবে উদ্যোগ নিতে হবে। নিম্ন আদালত থেকে বিচারিক কার্যক্রমকে স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করতে পারলে উচ্চ আদালতে মামলা জট কমিয়ে আনা সম্ভব। বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে স্থিতিশীল সমাজ ও রাষ্ট্র নিশ্চিত করা সম্ভব।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট