দারিদ্র মুমিনের সৌন্দর্য

মোহাম্মাদ মাকছুদ উল্লাহ

দারিদ্র মানব জীবনের এক অনাকাঙ্খিত অবস্থার নাম। দারদ্রিকে কেউ কেউ অভিশাপ বলেও অভিহিত করেছেন। খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের সংঙ্কট মানব জীবনকে বন্যপ্রাণীর পর্যায়ে নামিয়ে দেয়। সুতরাং তাকে অভিশাপ ছাড়া আর কিইবা বলা যেতে পারে! আল্লাহর নবী হযরত মোহাম্মাদ (সা.) দারিদ্র থেকে বাঁচবার জন্য ফরজ নামাযের পর এই দোআটি পাঠ করতেন: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযু বিকা মিনাল কুফরি ওয়াল ফাক্রি, ওয়া আউযু বিকা মিন আযাবিল কব্রি।’ অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট কুফরি ও দারিদ্র থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং আশ্রয় প্রার্থনা করছি কবরের আযাব থেকে।(সুনানে নাসাঈ: ১৩৪৭, সহীহ ইবনে খুজাইমাহ: ৩৬৭, মুসতাদরাকে হাকেম: ৩৮৩) রাসূলে কারীম (সা.) দারিদ্রের প্রতি রুষ্ঠ হয়ে আত্মারক্ষার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে দো’আ করতেন বিষয়টি সে রকম নয়। বরং আল্লাহর রাসূল (সা.) উম্মতের দরিদ্র প্রকৃতির লোকদেরকে এ শিক্ষা দেয়ার জন্য উক্ত দো’আ করতেন যে, বৃত্ত ও দারিদ্র সব অবস্থাই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার পরীক্ষার জন্য আরোপিত। সুতরাং অনাকাঙ্খিত অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায়ও আল্লাহ বের করে দিবেন। বস্তত রাসূলুল্লাহ (সা.) দারিদ্র ক্লিষ্ট জীবনকেই পছন্দ করতেন এবং তাঁর পুরোটা জীবনই ওই অবস্থাথার মধ্যদিয়ে কেটেছে। হযরত আনাস (রা.) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, নবী করীম (সা.) দোআ’তে বললেন,‘হে আল্লাহ! তুমি আমাকে মিসকীন অবস্থায় জীবিত রাখো, মিসকীন অবস্থায় মৃত্যু দান করো এবং মিসকীনদের দলে হাশর করো।’ হযরত আয়েশা (রা.) বললেন, কেন হে আল্লাহর রাসূল? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তারা ধনীদের চল্লিশ বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। হে আয়েশা! কোন মিসকীনকে তোমার দুয়ার থেকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিও না, এক টুকরা খেজুর হলেও দিও। হে আয়েশা! মিসকীনকে ভালোবাসো এবং তাদেরকে নিজের কাছে জায়গা দিও, তাহলে মহান আল্লাহ কিয়ামাতের দিন তোমাকে নিকটে রাখবেন।(সুনানে ইবনে মাযা: ৪১২৬, জামে আত-তিরমিযী: ২৩৫২, আস-সুনানুল কুবরা: ১৩৫৩০) হযরত আবূ উমামা (রা.) হতে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, নবী করীম (সা.) বলেছেন, আমার রব আমাকে মক্কার বাতহা (কঙ্করময় এলাকা) স্বর্ণে পরিণত করে দেয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। আমি বললাম, হে আমার রব! প্রয়োজন নেই, বরং আমি একদিন তৃপ্তিসহ আহার করব আর একদিন ক্ষুধার্থ থাকব। একই কথা তিনি তিনবার বললেন। অতঃপর বললেন, যখন ক্ষুধার্থ থাকব তখন তোমার নিকট প্রার্থনা করব এবং শুধু তোমাকেই স্মরণ করব আর যে দিন আহার করব সে দিন তোমার শুকরিয়া আদায় করব এবং তোমার প্রশংসা করব।(জামে আত-তিরমিযী: ২৩৪৭, মেশকাতুল মাসাবীহ: ৫১৮৯)

ধন-দৌলত, সম্পদ-সম্ভার মহান আল্লাহর দান। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যাকে ইচ্ছা বেশুমার সম্পদের মালিকানা দান করেন আবার যাকে ইচ্ছা পথের ফকির বানিয়ে দেন। এরশাদ হয়েছে,“আল্লাহ যাকে ইচ্ছা রিযিকে প্রসস্ততা দান করেন এবং শংকুচিত করেন। তারা পার্থিব জীবন নিয়ে আনন্দিত। অথচ পার্থিব জীবন পরকালের তুলনায় খুবই সামান্য।”(সূরা আর-রা’দ: ২৬) আরো এরশাদ হয়েছে,“আপনি বলে দিন, আমার রব স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা রিযিক বাড়িয়ে দেন এবং সীমিতি করে দেন। তোমরা যা কিছু ব্যয় কর তিনি তার বিনিময় দান করবেন। তিনি উত্তম রিযিক দাতা।”(সূরা আস-সাবা: ৩৯) বস্তুত আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুমিন বান্দাকে দারিদ্রের ক্লীষ্টতায় আক্রান্ত করে তার ঈমানের পরীক্ষা নেন। এরশাদ হয়েছে,“আর অবশ্যই আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো কিছুটা ভীতি আর ক্ষুধায় আক্রান্ত করে, জীবন ও সম্পদের ক্ষতি সাধন করে এবং ফল ও ফসল নষ্ট করে। তবে সুসংাদ দাও সবকারীদেরকে। যখনই তাদের উপর কোন বিপদ চেঁপে বসে তখন তারা বলে, নিশ্চয়ই আমরা সকলে আল্লাহর জন্য এবং আমরা সকলে আল্লাহর সান্যিধ্যে ফিরে যাব।(সূরা আল: বাক্বারাহ: ১৫৫-১৫৬)

যাপিত জীবনের দারিদ্র-দুর্গতি, শোক-সংকীর্ণতা, ব্যথা-যন্ত্রণা আপাতত কষ্টের ও বিষাদের হলেও পরজীবন বিবেচনায় দারিদ্র মুমিনের জীবনের সৌন্দর্য। কারণ ইহকালীন জীবন তো ক্ষণস্থায়ী আর পরকালীন জীবন চিরস্থায়ী। প্রত্যেকটা মানুষ জীবনের ব্যপক পরিসরে শান্তি-সমৃদ্ধির জন্য সাময়িক কষ্ট আর যন্ত্রণাকে বিনিয়োগ হিসেবে জানে এবং বরণ করে। তাইতো জীবনের একটা দীর্ঘ সময় সকলকে বিরক্তিকর শিক্ষা ও প্রশিক্ষনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পরকালের বিষটাও তেমনি। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আদ-দুনিয়া মাযরাআ’তুল আখিরাহ” অর্থাৎ পৃথিবীটা পরকালের শস্যক্ষেত্র। জমি কর্ষণ, বীজ বপন, আগাছা নিধন, সেচ ও সার সময়মত পরিমিতহারে প্রদান, বালাই নাশক ও জমির যথাযথ নরিাপত্তা বিধান, ফসল কর্তণ অতঃপর মাড়াই করার পরই খাবার উপযোগি খাদ্য ঘরে আসে। দু’বেলা খাবারের জন্য যদি এতসব কষ্ট স্বাভাবিক হতে পারে, তাহলে অনন্তকালীন জীবনের সুখ-শান্তির জন্য আল্লাহর বিধান পালনের কষ্ট, সে তো থোড়াই। হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, পৃথিবীটা মুমিনের জন্য জেলখানা আর কাফেরের জন্য জান্নাত সাদৃশ।(সহীহ মুসলিম: ২৯৫৬, জামে আত-তিরমিযী: ২৩২৪, সুনানে ইবনে মাযা: ৪১১৩, মুসনাদে আহমাদ: ৮০৯০, ৯৯১৬) হযরত আবু হুরায়রা (রা.) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দরিদ্র মুমিনগণ ধনীদের অর্ধদিবস অর্থাৎ পাঁচশত বছর পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করবে।(জামে আস-সুন্নাহ: ৪১৫৫) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা.) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, দরিদ্র মুহাজিরগণ রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নিকট ‘ধনীদেরকে মহান আল্লাহ তাদের উপর বেশি মর্যাদান দান করেছেন’ মর্মে অভিযোগ করলে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে দরিদ্র বন্ধুগণ! আমি এ ব্যাপারে তোমাদেরকে শুভসংবাদ প্রদান করব না যে, দরিদ্র মুমিনগণ তাদের ধনীদের চেয়ে অর্ধদিবস পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর পরকালের অর্ধদিবস দুনিয়ার পঁচশত বছরের সমান। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) তেলাওয়াত করলেন ‘তারা আপনাকে আযাব তরাম্বিত করতে বলে। অথচ আল্লাহ কখনো তাঁর ওয়াদা ভঙ্গ করেন না। আর আপনার রবের একদিন তোমাদের গণনার এক হাজার বছরের সমান। সূরা-আল-হাজ¦: ৪৭’।(জামে আস-সুন্নাহ: ৪১৫৫) আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সকল মুমিনের হৃদয়কে ধৈর্যের গুণে পরিপূর্ণ করে দিন, জান্নাতের বিনিময়ে পার্থিব জীবনে দারিদ্রকে সৌন্দর্য হিসেবে বরণ করার তাওফিক দান করুন!

লেখক: পেশ ইমাম ও খতীব, রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট