প্রধানমন্ত্রীর ত্বরিত পদক্ষেপ তেলবিদ্যুৎ কেন্দ্র পূর্ণ উৎপাদনে ফিরছে, দ্রুত কমবে লোডশেডিং
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ত্বরিত পদক্ষেপে লোডশেডিং কমানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি করতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে শিল্প খাতে সরবরাহ বাড়ানোরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের মাধ্যমে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। ফলে আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরলে জাতীয় গ্রিডে আরো প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হতে পারে। এতে আশা করা যায়, লোডশেডিং কমার পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতে সাশ্রয় হওয়া গ্যাসশিল্পে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
জানা যায়, দেশে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ। এর পরও দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিতে মানুষ। সম্প্রতি বিদ্যুৎ চাহিদা ও সরবরাহে ঘাটতি থাকায় সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছেছে লোডশেডিং। গ্রাম ছাড়িয়ে লোডশেডিংয়ের তীব্রতা এখন শহরেও এসে ঠেকেছে। অভিযোগ রয়েছে, গ্রামাঞ্চলের অনেক এলাকায় দিনে আট থেকে ১৪ ঘণ্টারও বেশি সময় লোডশেডিং হয়েছে। এতে জনজীবন প্রায় বিপর্যস্ত। যদিও এখন লোডশেডিং পরিস্থিতি কিছুটা কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও শিল্প—দুই খাতের সংকট একসঙ্গে মোকাবেলায় সরকারের এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগে শিগগিরই শিল্পের দীর্ঘদিনের গ্যাসসংকট এবং বিদ্যুৎ খাতের লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একদিকে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হবে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে শিল্পে সরবরাহ বাড়ানো হবে। ফলে একই সঙ্গে লোডশেডিং ও শিল্পের গ্যাসসংকট কমানোর পথ তৈরি হচ্ছে।
এ বিষয়ে দেশের বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার এরই মধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল পরিশোধের সিদ্ধান্তের কথা আমাদের জানিয়েছে। বকেয়া বিল পরিশোধ ও হিসাব হালনাগাদ হলে কেন্দ্রগুলো আবার পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারবে। বর্তমানে বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় দুই হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। বকেয়া বিল পরিশোধ করা হলে আরো প্রায় দুই হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।’ তিনি বলেন, ‘বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বকেয়া বিল না পাওয়ায় জ্বালানি তেল আমদানি করতে পারছিল না। ফলে আমাদের মোট উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছিল না। বকেয়া পরিশোধ করা হলে তিন সপ্তাহের মধ্যে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতার কাছাকাছি উৎপাদনে যেতে পারবে। এতে একদিকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়বে এবং লোডশেডিং কমবে, অন্যদিকে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর চাপ কমবে। ফলে সাশ্রয় হওয়া গ্যাস শিল্প খাতে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যেই এর ইতিবাচক প্রভাব দেখা যেতে পারে।’
ডেভিড হাসনাত আরো বলেন, ‘ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ বিল বকেয়া জমেছে ১২ হাজার কোটি টাকার মতো। গড়ে প্রায় ছয় মাসের বিল বকেয়া। এই অর্থ পরিশোধ করা হলে কেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করে দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারবে। সরকার তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে, যার কারণে দ্রুত বকেয়া পরিশোধের ব্যবস্থা নিয়েছে।’
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বলছে, গত সোমবার বিকেল ৩টায় বিদ্যুতের মোট চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৩৯৬ মেগাওয়াট, তখন সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৮২৩ মেগাওয়াট। এ সময় লোডশেডিং ছিল এক হাজার ৫৭৩ মেগাওয়াট। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের কিছু কর্মকর্তার ভুল সিদ্ধান্ত, সিন্ডিকেশন, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাঁরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী আগেই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে এই লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিতে পড়তে হতো না সাধারণ মানুষকে। ভবিষ্যতে সংকট এড়াতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ এবং আগাম পরিকল্পনা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্র জানায়, আপাতত ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে সর্বোচ্চ প্রায় চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রগুলোকে প্রায় ৮০ শতাংশ সক্ষমতায় চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় তা দ্রুত ৯০ শতাংশে উন্নীত করার নির্দেশও আসতে পারে। এ জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) যথাসম্ভব ফার্নেস অয়েল মজুদ করতে বলা হয়েছে। বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতে হঠাৎ করে ফার্নেস অয়েলের চাহিদা ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এখন তেল বিতরণ কম্পানিতে তেলের মজুদ বাড়াতে বেশি করে আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিপিসি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির বর্তমান দামের কারণে পরিস্থিতিও কিছুটা বদলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্পট মার্কেটে টেন্ডার করেও কাঙ্ক্ষিত সময়ে এলএনজি সরবরাহকারী পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ২৬ আগস্টের জন্য নির্ধারিত কার্গোও পাওয়া যায়নি। ফলে স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখা কঠিন হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন। সূত্র: কালের কন্ঠ
