সম্পাদকীয়

গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট উত্তরণে জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে

বিগত সরকারের বল্গাহীন লুটপাট ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের কারণে তারেক রহমানের সরকারকে এমনিতেই বড় ধরনের সামাজিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সে চ্যালেঞ্জ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সারাদেশে অভূতপূর্ব বিদ্যুৎ বিভ্রাট, লোড শেডিং, আবাসিক এবং বাণিজ্যিক লাইনে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার মধ্য দিয়ে রান্নাঘরের চুলা এবং কারখানার চাকা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জনদুর্ভোগ ও ক্ষোভ বেড়ে চলেছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বাস্তবতায় জ্বালানি সংকট একটি বিশ্ববাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের আঁচ অনেকটা কমে আসার সাথে সাথে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে ওঠার কথা থাকলেও বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি আরো জটিল ও সংকটপূর্ণ হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি হঠাৎ করেই দেখা দেয়নি। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে সরবরাহ লাইনে সৃষ্ট সংকট সত্ত্বেও গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি এ অঞ্চলে ও লোড শেডিং এতটা প্রকট হয়ে ওঠেনি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে হরমুজ প্রণালিতে বিশেষ ছাড় বা সুবিধাপ্রাপ্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া থেকে আমদানি নির্ভর ভারত থেকে জ্বালানি আমদানি করে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করলেও মধ্যপ্রাচ্য ও চীনের মতো স্থিতিশীল দেশের সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্ব কাজে লাগিয়ে সংকটের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ এখনো দেখা যাচ্ছে না। দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে বহুমাত্রিক সামাজিক-অর্থনৈতিক সমস্যা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হচ্ছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধিসহ মূল্যস্ফীতি বেড়ে চলেছে। বিদ্যুৎ সংকটে দেশের কোল্ড স্টোরেজগুলোতে আলু, পেঁয়াজ, ফলমূলসহ পঁচনশীল পণ্য সংরক্ষণ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। মূলত রফতানিবাণিজ্যসহ শিল্প খাতের সব সেক্টরেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের আঁচ লেগেছে। এক্সিলারেট পরিচালিত ফ্লোটিং এলএনজি টার্মিনালের গোলযোগ ও সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া এবং এলএনজি ট্যাঙ্কার নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন অস্বাভাবিক হ্রাস পাওয়ার ঘটনাগুলো একই সময়ে ঘটছে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা যেসব কথাবার্তা বলছেন, তা জনমনে সংশয় ও ক্ষোভ আরো বাড়িয়ে তুলছে। যেখানে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ছাড়া একদিনও চলে না, সেখানে সংকটের নেপথ্য কারণ উদঘাটন ও সংকট সমাধানে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আশাপ্রদ বক্তব্য না দিয়ে জ্বালানি সংকট সমাধানে ২ বছর, ১০ বছরের টাইমলাইন শোনাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। আবার কেউ কেউ বিদ্যুৎ সংকটের চলমান পরিস্থিতির জন্য বর্তমান সরকারের ন্যূনতম দায় এড়িয়ে শুধু কথার ফুলঝুড়ি ছড়াচ্ছেন। গতকাল ইনকিলাবে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায়, সরকার জ্বালানি তেলের মজুদ বর্তমানের দেড় মাস থেকে ৬ মাসে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এটি অবশ্যই আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ। তবে দেশের মানুষ বিদ্যুৎ উৎপাদন, এলএনজি আমদানি ও অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নে দ্রুততম সময়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চায়। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোড শেডিংয়ের বিড়ম্বনায় মানুষ অতীষ্ট। জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। নজিরবিহীন বিদ্যুৎ সংকট আর সরকারি দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজির কারণে দেশের কোথাও কোথাও সরকারের জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টির সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। বছরের শেষদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে জনদুর্ভোগ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুততম সময়ে কার্যকর অগ্রগতি অর্জন করতে না পারলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরকারিদলের ভরাডুবির আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটকে পুঁজি করে সরকারবিরোধী আন্দোলনের ইন্ধন দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের বহুমাত্রিক কারসাজি ও নাশকতার পরিকল্পনাও থাকতে পারে। সংকট উত্তরণে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগই হতে পারে সব সংকট ও আশঙ্কার প্রত্যাশিত সমাধান। বিশেষত স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বাড়িয়ে, ভোলাসহ নতুন গ্যাসক্ষেত্রগুলোর বাড়তি উৎপাদন জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার মাধ্যমে ঘাটতি কমিয়ে আনা খুব কঠিন নয়। এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালকে দ্রুত সরবরাহ লাইনে ফিরিয়ে আনতে হবে। দেশীয় গ্যাস, কয়লা এবং নবায়নযোগ্য বিকল্প জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
 
 

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট