|

কালবৈশাখী ও শিলাবৃষ্টি: রাজশাহীতে ফসল, চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের ক্ষতি

রাজশাহীতে বছরের প্রথম কালবৈশাখী ঝড়ের সঙ্গে আকস্মিক শিলাবৃষ্টিতে ফল ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমের গুঁটি (কড়ালি) অবস্থায় এমন দুর্যোগে মাথায় হাত পড়েছে চাষি ও বাগানিদের। জমির গম কাটার ঠিক আগমুহূর্তে শিলাবৃষ্টিতে জমির পাকা ও আধাপাকা গম মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। কোথাও শিলার আঘাতে পেঁয়াজের কদমের শীষ ভেঙে জমিতে শুয়ে গেছে। অন্যদিকে, মৌসুমের শুরুতেই চাঁপাইনবাবগঞ্জে তাণ্ডব চালিয়েছে আকস্মিক শিলাবৃষ্টি।Geographic Reference

মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ৩টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত জেলা সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বড় আকারের শিলাবৃষ্টির খবর পাওয়া গেছে। হঠাৎ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে আম চাষি ও কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। এদিকে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতেও ঝড় ও শিলাবৃষ্টির খবর পাওয়া গেছে। সেখানে বিশেষ করে লিচুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, যা স্থানীয় বাগান মালিকদের জন্য বড় আর্থিক ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রাজশাহী জেলার দুর্গাপুর ও বাগমারা উপজেলার কিছু অংশে কালবৈশাখী ঝড়ের সঙ্গে শিলাবৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে দুর্গাপুর উপজেলায় আকস্মিক এই শিলাবৃষ্টি ঝরেছে প্রায় ২০ মিনিট ধরে। এর আগে বিকেলের দিকে হঠাৎ করেই আকাশ কালো হয়ে আসে। দমকা হাওয়ার সঙ্গে শুরু হয় ঝড়। কিছুক্ষণের মধ্যেই নামে তীব্র শিলাবৃষ্টি। প্রায় ২০ মিনিটের এই প্রাকৃতিক তাণ্ডবে জেলায় ফল ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। দেখা গেছে, অনেক কৃষকের জমিতে গম মাটিতে নুয়ে গেছে।

বিশেষ করে যেসব গম প্রায় পেকে গিয়েছিল, সেগুলোর ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। শিলার আঘাতে গমের শীষ ঝরে পড়েছে, পাশাপাশি ভুট্টা, গম, মরিচ, পেঁয়াজের কদমসহ সবজি খেত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু তাই নয়, আমের মৌসুমের শুরুতেই গাছে আসা ছোট গুঁটি ঝরে পড়ায় উদ্বিগ্ন বাগান মালিকরাও। সিংদা এলাকার পেঁয়াজ চাষি আবদুল কুদ্দুস জানান, এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছিলাম। এখনো ১০ কাঠা জমির পেঁয়াজ তুলতে বাকি আছে। গতকাল বৃষ্টির সময় শ্রমিকরা মাঠে কাজ করছিল। পানিতে পেঁয়াজ ভিজে গেছে।

পেঁয়াজের কদম (বীজ) চাষি আলম বলেন, শিলাবৃষ্টি ক্ষতি হয়েছে। সার, সেচ, শ্রমিক সবকিছুর খরচ বাড়তি। এর মধ্যে এই ক্ষতি আমাদের পথে বসিয়ে দেবে। আম চাষি আমিনুল হক বলেন, মৌসুমের শুরুতেই ব্যাপক ঝড় ও শিলা বৃষ্টি হয়েছে। ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে অনেক গুঁটি আম ঝরে গেছে। এ বিষয়ে দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি অফিসার সাহানা পারভীন লাবনী বলেন, শিলাবৃষ্টি হয়েছে। আমাদের দুর্গাপুরের মাঠে গম এবং পেঁয়াজ উঠে গেছে। কিছু কিছু জমিতে আছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আজ বুধবার জানা যাবে। বৃষ্টির বিষয়ে রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র পর্যবেক্ষক গাউসুজ্জামান বলেন, রাজশাহী শহর এলাকায় বৃষ্টিপাত হয়েছে, তবে শিলাবৃষ্টি হয়নি। কী পরিমাণের বৃষ্টি হয়েছে, সেটি পরে জানানো হবে।Geographic Reference

আমের রাজধানীতে ব্যাপক শিলাবৃষ্টি: গতকাল বিকেল ৩টার দিকে হঠাৎ করেই কালো মেঘে ঢেকে যায় জেলার আকাশ। এর কিছুক্ষণ পরেই শুরু হয় ঝোড়ো হাওয়া ও শিলাবৃষ্টি। স্থানীয়রা জানান, শিবগঞ্জ উপজেলার বিনোদপুর, শ্যামপুর, কানসাট ও চককীর্তিসহ বেশ কিছু ইউনিয়নে শিলার তীব্রতা ছিল সবচেয়ে বেশি। পরে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জেলা সদরেও বৃষ্টি ও শিলা শুরু হয়। বর্তমানে আমগাছগুলোতে আমের গুটি বড় হতে শুরু করেছে। এই অবস্থায় বড় আকারের শিলা পড়ায় গাছ থেকে প্রচুর পরিমাণে গুটি আম ঝরে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। আম চাষিরা জানান, শিলার আঘাতে আমে দাগ পড়ে যায় এবং পচন ধরার আশঙ্কা থাকে, যা ফলন বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। এছাড়া বোরো ধান, সবজি ও অন্যান্য মৌসুমি ফসলেরও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন মাঠপর্যায়ের কৃষকরা।

শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নয়ন মিয়া জানান, দুপুরের পর উপজেলার বিনোদপুর, শ্যামপুর, কানসাট, চককীর্তিসহ কয়েকটি ইউনিয়নে শিলাবৃষ্টি হয়েছে। শিলার আকারও কোন কোন জায়গায় বড় ছিল। এতে ফল ও ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই বৃষ্টিতে বোরো ধান ও পাট ক্ষেতের জন্য উপকার হয়েছে। কারণ বোরো ধান ও পাট খেতে সেচের প্রয়োজন ছিল। তবে শিলাবৃষ্টির কারণে আমের ক্ষতি হয়েছে। তিনি আরও জানান, তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা কাজ শুরু করেছেন। তথ্য সংগ্রহ শেষে ক্ষতির সঠিক পরিমাণ জানা যাবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুনাইন বিন জামান জানান, বেশ কিছু এলাকা থেকে শিলাবৃষ্টিতে আমের ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। কৃষি কর্মকর্তারা ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কাজ করছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ডা. মো. ইয়াসিন আলী জানান, পুরো জেলাজুড়েই হালকা বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি হয়েছে। এতে কাটা গম বাদে সব ফসলের জন্যই ভালো হয়েছে। তবে শিবগঞ্জে সবচেয়ে বেশি শিলাবৃষ্টি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ শেষে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

দিনাজপুরে লিচুর ক্ষতি:

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলততে তীব্র শিলাবৃষ্টিতে কয়েক হাজার ঘরবাড়ি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বড় আকারের শিলার আঘাতে ঘরের টিনের চাল ফুটো হয়ে গেছে এবং আম-লিচুসহ বিভিন্ন ফলের বাগান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিকালে উপজেলার এলুয়াড়ী ইউনিয়নের রুদ্রানী গ্রামসহ এলুয়াড়ী ও কাজিহাল ইউনিয়নের প্রায় ১০ টি গ্রামে এ শীলাবৃষ্টি হয়ে ঘরবাড়ী ও ফসলের ক্ষতি হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টা ধরে বড় বড় শিলা পড়তে থাকে। এতে রুদ্রানী গ্রামসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। রুদ্রানী গ্রামের বাসিন্দা মসলেম উদ্দিন বলেন, হঠাৎ করেই বড় বড় শিলা পড়া শুরু হয়। শিলার আঘাতে ঘরের টিনের চাল পুরোপুরি ফুটো হয়ে গেছে।

এলুয়াড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ নবিউল ইসলাম জানান, শিলাবৃষ্টির আঘাতে রুদ্রানী গ্রামসহ এলুয়াড়ী ও কাজিহাল ইউনিয়নের আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের কয়েক হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে আম ও লিচুর বাগানেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঘটনার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আহম্মেদ হাচান এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। ইউএনও আহম্মেদ হাচান বলেন, ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়া হবে।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *